মঙ্গলবার, ২ মে, ২০১৭

উৎসবে 


১৩ই মে, ১৯৬১
     প্রায় দু'বছর পরে দেশে ফিরলাম। নিজের ঘরে, নিজের টেবিলে বসে পুরোনো বই আর খাতার গন্ধের ভিড়ে আচ্ছন্ন হয়ে পরেছিলাম। একটা পুরোনো ডায়রি পেয়ে তাই লিখতে বসলাম। 

আমার মেজকাকুর ছিল মাছের ব্যাবসা। ছোট কাকু বিয়ের পরে বৌ আর এক কন্যা সন্তান নিয়ে আলাদা হয়ে যান। পরে থাকলাম আমরা। মেজকাকু বিয়ে করেছেন, কিন্তু কোন ছেলেপুলে ছিলনা। কাকিমাও আত্মীয়দের গঞ্জনা সহ্য করতে করতে কেমন যেন যান্ত্রিক হয়ে পরেছিলেন। তখন অত বুঝতাম না, কাকিমা কে খারাপ কথা বলার কারণগুলি। আজ বুঝি, তবে এখন সে'সব অপ্রাসঙ্গিক। মেজকাকিমা শেষে আত্মহত্যা করেছিলেন। বাবা সরকারি চাকরিতে ছিলেন। অর্থাৎ, আমাদের সংসারের এক এবং অদ্বিতীয় সম্পদ। অর্থাভাব লেগেই ছিল পরিবারে। বাবাকে একাই সংসার টেনে নিয়ে যেতে হত। পৈতৃক সম্পত্তি বলতে ছিল এই একফালি ছাদ, আর কিছু জমি। পুকুরটা অবশ্য মেজকাকু ব্যাবসার খাতিরে নিলেও, কোনদিন টাকা নিয়ে আসতে পারতেন না ঘরে। মা আর মেজকাকিমা মিলে কিভাবে যে সংসার চালাতেন, এখনও আমার বোধশক্তির বাইরে। 

বাবা সরকারি চাকুরে হলেও আমাদের যে খুব সুখ-আহল্লাদ ছিল, তা নয়। আমার পড়াশোনা করবার সরঞ্জাম তার সাক্ষ। বাবাদের অফিসের পুরোনো এস্টিমেট বই, টাইপ করা দলিলের কিছু অদরকারি পাতা। এই ছিল আমার অঙ্ক কসবার সরঞ্জাম। কলমের যোগানও বাবার অফিস থেকেই আসত। এখন হাসি পায় বাবার কথা ভাবলে। সরকারি কর্মচারীদের ঘুষ নেওয়ার কথা বাজারে প্রচলিত আছে। আমার বাবা পুরোনো কাগজ আর কিছু কলম ছাড়া অতিরিক্ত কিছুই বাড়িতে আনতে পারেন নি। বাবার এক বন্ধু সমীর কাকু মাঝে মধ্যে আসতেন। বাবার অর্থ সাহায্য প্রয়োজনে যেমন আসতেন, আবার প্রাপ্য টাকার সুদটুকু নিতেও আসতেন। উনি ছিলেন একটি ব্যাংকের ম্যানেজার। টাকার অভাব ওনার সেরকম ছিল না। আবার সুদের ব্যাবসা করে উপরি আয়ও কম ছিল না। ওনার অবদান আমাদের পরিবারে আর কিছু না হোক, আমার জন্যে প্রায়ই ব্যাংকের বাতিল করা  statement আর টাইপ করা নোটিশের কাগজ এনে দিতেন। 

স্কুল ফাইনালের কিছু আগে বাবা অসুস্থ হয়ে পরলেন। চলেও গেলেন হপ্তা কয়েক লড়াই করে। মা-কে অফিস থেকে একটা চাকরি দেওয়া হল। একদিন মা-এর সাথে অফিস গিয়েছিলাম। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ফাইল পৌঁছে দেয়া, বড়বাবুদের ঘরে চা পৌঁছে দেওয়া, আর কাউকে তলব থাকলে জানিয়ে আসা। এই ছিল মা-এর সরকারি চাকরি। যদিও আমার বাবা এই কাজে ছিলেন না। কিন্তু মা-এর যোগ্যতা অনুযায়ী এর চেয়ে বেশি কিছু  সম্ভব ছিল না। মা-এর কাজের বরাদ্দ দিনলিপি দেখার পর থেকেই মনে মনে ছক বানিয়ে ফেলি। চিটচিটে কার্বন পেপার এর ছোপ লাগা পুরোনো কাগজে অঙ্ক কষেই হোক, বা ব্যাংকের statement, অফিসের এস্টিমেট পড়েই হোক। লাভ-ক্ষতি আর সুদ-কষার অংক আমার মাথায় যেন ছকের মত সাজানো হয়ে গিয়েছিল। স্কুল ফাইনালের আগেই নেমে পরলাম ব্যাবসায়। 

ধারে ডুবে যাওয়া প্রায় বন্ধ হতে বসা একটা ব্যাবসাকে তিলে তিলে গড়ে তুললাম আমি। প্রথম বছরেই সব দেনার সুদ মিটিয়ে লাভ হল সাতশো আশি টাকা। এই প্রথম মেজকাকু নিজের ব্যাবসায় টাকার মুখ দেখলেন। স্কুল ফাইনালের পরে সেই লাভের অঙ্ক নিয়ে গেলাম পঞ্চাশ হাজারে। আর আজ আমার মেজকাকুর ব্যাবসা এই চত্তরের সবচেয়ে বিত্তবান ব্যাবসা। পঞ্চান্নতে বি.এ. পাশ করে মোট লাভের একটা অংশ নিয়ে আমেরিকা চলে যাই। ব্যাবসা নিয়ে পড়াশোনা করে আরো বড়লোক হব বলে। আর যাই হোক ব্যাবসায় আমার কৃতিত্ব আছে। মা-কেও চাকরি থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসি। পিওনের কাজ করে সামান্য মাইনের চাকরি করবার কোন প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাইনি। ওদেশে একটা চাকরি জোগাড় করে নিজের পড়াশোনা আর থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেশে ফিরেছিলাম একবার। তারপর পড়া শেষ করে আবার এই এলাম। 




                                                                    //১//
এখন:


ডায়রির লেখক স্বর্গীয় বিষ্ণু কিশোর মুখোপাধ্যায়, আমার বাবা। চিলেকোঠার ঘরে বাবার জিনিসপত্র ঘটতে গিয়ে ডায়রিটা পেয়েছিলাম। ঝরঝরে ইংরেজিতে পরিষ্কার হাতের লেখায় কিছু দিনের ঘটনাবলী সাজানো রয়েছে।
মানুষটার সাথে আমার প্রথম আলাপ স্কুলে, প্রিন্সিপালের ঘরে। ক্লাস থেকে বেয়ারা জয়দেব দা যখন আমায় ডেকে নিয়ে গেল। মনে মনে নিজের কীর্তিগুলোর ফর্দ অনুযায়ী কৈফিয়ৎ সাজিয়ে নিচ্ছিলাম। পরে করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় জয়দেব দা যখন বলল আমার বাড়ির লোক এসেছে বলে ডেকে পাঠানো হয়েছে। দুশ্চিন্তাগুলো খানিকটা প্রশমিত হয়। কিন্তু ভয়টা পুরোপুরি যায়নি। প্রিন্সিপালের ঘরে ঢুকে যে লোকটাকে দেখলাম, খুব চেনা বলে মনে হয়নি। প্রায় ছ'ফিট লম্বা, ধবধবে ফর্সা, এক মাথা পরিপাটি করে আচড়ানো চুল, আর এক চিলতে গোফ। এই চেহারা সিনেমার পোস্টারে দেখেছিলাম বলে মনে হয়। কিন্তু কিছুতেই পরিচিত বলে মনে হয়নি। আমার এক বন্ধু সিনেমায় একবার কাজ করেছে। ওর মুখে নায়কদের বর্ণনা শুনেছিলাম। বিভুর মত আমারও কি ভাগ্যের চাকা ঘুরল? বেশ বুক ভরে শ্বাস নিয়ে লোকটার দিকে তাকালাম।


আমার সামনে এসে হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে ভদ্রলোক সবার সামনেই আমায় জড়িয়ে ধরলেন। তারপর কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, "আমি তোমার বাবা, নৃপেন্দ্র।"

লোকটা বলে কি? এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলাম। আপাদমস্তক আরেকবার লোকটাকে জরিপ করে নিয়ে প্রিন্সিপাল স্যারের দিকে তাকালাম। আমাদের প্রিন্সিপাল, ফাদার স্ট্যানলি, সাহেবও এগিয়ে এসে একটা কিম্ভূত হাসি দিয়ে বললেন, "হি ইজ ইওর ফাদার নির্পেন্দ্ররা।" সাহেবের উচ্চারণটা আজ আর কানে লাগেনি। ভয়, অভিমান, না রাগ; কোনটা যে কাজ করেছিল মনে জানিনা। এক দৌড়ে প্রিন্সিপালের ঘর থেকে পালিয়ে ক্লাসে চলে এসেছিলাম। সেই আমার প্রথম আলাপ বাবার সাথে। 

                                                                      //২//

আমার দেশের বাড়িতে বেশ ধুমধাম করে কালী পুজো হয়। মা-এর কাছেই শুনেছি আমার ঠাকুরদা অভয় কিশোর মুখোপাধ্যায় এই পুজো শুরু করেছিলেন। আর্থিক কারণে বন্ধ হয়ে গেলেও, আমার বাবা সেই পুজো আবার চালু করেন। অবশ্য পুজো শুরু করবার তিন বছর পরেই উনি বাড়ি থেকে চলে যান। আমার মা-কে বিশেষ পছন্দ করতেন না উনি। আমার বয়স তখন দশ মাস, সদ্য হামাগুড়ি দিতে শিখেছি। বড্ড খামখেয়ালি মানুষ ছিলেন বাবা। নিজের ব্যাবসা আর টাকা পয়সা ছাড়া কিছুই বুঝতেননা। আমার মা-কে সময় দেওয়া দূরে থাক, সামান্য কথাটুকু বলতেন না।  ঠাকুমা বাবা-র এই আচরন সমর্থন করেননি বলেই মা-কে নিজের কাছে রেখে দেন। আর ছেলেকে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে বলেছিলেন। বিষ্ণু কিশোর অপেক্ষা করেননি, বা নিজেকে সংশোধন করবার চেষ্টাও করেননি। তাঁর মেজকাকু কে লেখা শেষ পোস্টকার্ড অনুযায়ী বাবা ইউরোপের কোন এক কারখানায় হিসেব রক্ষকের কাজ করছেন জানা গিয়েছিল। তারপর আর কোন যোগাযোগ নেই। 

স্কুলের সেই আলাপের পরে, বাবাকে আবার দেখলাম এ'বার কালীপুজোয় এসে। আমি এখন একটি বেসরকারি ব্যাংকে কাজ করি। প্রতি বছর কালী-পুজোর সময় আমি আর মা দেশের বাড়িতে আসি। ঠাকুমা আর আমার এক বিধবা পিসি এখন এই বাড়িতে থাকেন। জৌলুসটা ফিকে হয়ে গেলেও, আমার পিসতুতো ভাই-বোনেরা এলে বাড়িটা জমজমাট হয়ে ওঠে। আমার মা-এর বাপের বাড়ি থেকেও অনেকে আসেন। মোটমাট কালীপূজোটা আমাদের কাছে একটা খোলা মাঠের মত। সারা বছর যেন অপেক্ষা করে থাকি, এই মাঠে এসে একটু শ্বাস নেব বলে। এইবার অবশ্য পরিবেশটা একটু গুমোট হয়েছিল। বাবার হঠাৎ উপস্থিতি যেমন চাঞ্চল্য তৈরী করেছিল। অনেকের উদ্বেগের কারণও হয়ে উঠেছিল। আমার মা অবশ্য বেশ নির্বিকার ভাবেই ছিল। ঠাকুর আনা হল। চাতালের ধারে মন্ডপ সাজানো হল। আলোর রোশনাই দিয়ে ঘর ভরিয়ে দেওয়া হল। 

উৎসবের বোধয় একটা অন্য আমেজ থাকে। পুরোনো ক্ষোভ, অভিমান, আক্ষেপের উষ্ণ নিঃশ্বাসের উপস্থিতি থাকলেও সেটার উর্ধে উঠে আমরা যেন ভুলে থাকার ভান করি। এই যে এত বছর বাবার কোন খোঁজ ছিলনা। লোকটা আদৌ বেঁচে আছে কি-না তাও কেউ জানত না। হঠাৎ এমন ভাবে এসে পরলেও, সেই নিয়ে বিশেষ কোন আলোচনা কিন্তু হয়নি। নিয়মমাফিক সব কিছুই চলতে থাকে। এমনকি বাবাকেও দেখলাম আমার মাসতুতো বোন এর সাথে বসে মন্ডপের সাজ তৈরী করতে। 

                                                                      //৩//
১৭ই অক্টবর '৬১

দেশে ফেরার পরেই মা-যে আমায় এমনভাবে বিপদে ফেলে দেবে জানতাম না। চেনা নেই জানা নেই একটা মেয়ের সাথে আমার বিয়ে দেবার জন্যে মেতে উঠেছে যেন। এইবার কালীপুজোয় মেয়েটি এসেছিল। তার বাবা-মা কে একেবারে পাকা কথা দিয়ে মা-কালীর শাড়িটা অব্দি দিয়ে বসে আছে। বাবা চলে যাওয়ার পরে আবার এই পুজোটা শুরু করেছিলাম মা যাতে খুশি থাকে। আত্মীয়রা এলে বাড়ির থমথমে গুমোট ভাবটা, কিছু হলেও কমে। ছোট কাকু আর তাঁর পরিবারও এখন আসে শুনেছিলাম। এবার তা স্বচক্ষেই দেখলাম। কিন্তু মা-এর এই কথা দিয়ে ফেলাটা আমি কোন মতেই সমর্থন করতে পারছিনা। প্রতি বছর আমাদের মৃন্ময়ী মূর্তিকে যে শাড়ি পড়ানো হয়, তারই একটি মা সাধ করে তুলে রেখেছিলেন আমার স্ত্রী-কে দেবে বলে। কিন্তু যে মেয়েকে আমি এখনো চোখেই দেখলুম না, জানলুম না। তাকে এই ভাবে শাড়ি দিয়ে ফেলা মা-এর ঠিক হয়নি। 

মা-এর কথার অবাধ্য কোনদিন ছিলাম না। এখন বোধয় সময় এসেছে, সেই বিশ্বাসে একটা ইতি ঘোষণা করবার। পুজোর সময় কোনরকম পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয়, তাই কিছু বলিনি। কিন্তু ভাইফোঁটার পরের দিন মা যখন ডেকে বললেন ওবাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাওয়ার কথা। সত্যি নিজের রাগকে সংযত রাখতে পারিনি। অবশ্য, রাগ দেখিয়েও ফল কিছুই হয়নি। আজ সকালে পাত্রীর বাড়িতে আমায় যেতেই হল। 

পাত্রীর নাম শোভা বন্দ্যোপাধ্যায়। একটি কলেজে বি.এ পাঠরতা, সুশ্রী, সুদন্তী, সুকেশী, সুগায়িকা, এবং সর্বগুণ সম্পন্না। রান্নায় পারদর্শিনী, ও সাংসারিক কাজে অতুলনীয়া। সব ক'টি বিশেষণ এনার সাথে মিলে গেলেও, আমার পছন্দের সাথে মিল হয়নি। পাত্রীর বাবার কাছে অনুমতি পেয়ে শোভাকে নিয়ে ওদের বাগানে গিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম ভবিষ্যতে কি করবার ইচ্ছে রয়েছে? "বি.এ পাশ করবার পরে কি করবে?" উত্তরের বদলে শুধু নির্বাক, উদ্দেশ্যহীন, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা দুটো চোখ চেয়ে রইল আমার দিকে। মনে মনে দুটো বিশেষণ যোগ করে দিলাম পাত্রীর bio-data তে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত লাজুক, ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্লিপ্ত। 


কাজের বাইরে মেয়েদের সাথে আমার বিশেষ ভাবে আলাপ আলোচনা হয়নি কোনদিন। যে প্রশ্নগুলি মাথায় নিয়ে শোভার সাথে কথা শুরু করতে গিয়েছিলাম, সব কিছুই কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে গেল উদ্দেশ্যহীন, নির্লিপ্ত চোখ দুটো দেখে। মেয়েদের শরীরের প্রতি আকর্ষণ, পুরুষ মানুষের দুর্বলতা। শোভা সেই দিক থেকে নিশ্চই আকর্ষণীয়। কিন্তু,  বিয়ে তো কেবল শরীর চর্চায় আবদ্ধ ক্লীব সম্পর্ক নয়? আজ কাল পরশু শরীরের প্রতি আকর্ষণ থাকে। কিন্তু তার পরে কি শুধুই চাল-ডাল আর হেঁসেলের খবর নিয়ে সম্পর্ক টিকে থাকে? মেজকাকিমার সন্তান হবার কোন সম্ভাবনা নেই দেখে মেজকাকু নিজের ঘরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কাকিমা চলে যাওয়ার পরে মেজকাকুর অন্য নারীসঙ্গ পাওয়ার প্রতি আকর্ষণ আমি দেখেছি। কিন্তু ঠাকুমা আর আমার মা-এর কড়া শাসনের জন্যেই বিপথে যেতে পারেননি। শোভার সাথে আমার সম্পর্কটাও কি সেই স্বার্থের জন্যেই হবে? একজন স্ত্রী তার স্বামীর অভাবগুলির পরিপূরক হয়ে আসে। আমি সেই ভাবেই আমার স্ত্রী-কে দেখতে চেয়েছিলাম। যার কাছে আমার আকর্ষণটা শরীরের বাইরেও একটা কারণে থাকবে। সেটা হল মতের অমিল, যুক্তি দিয়ে তর্ক করা। মস্তিষ্কের চর্চা করা। বারবার হেরে যাবো আমি তার কাছে নতুন কিছু জানার চেষ্টায়। এক সাথে দুজনে মিলে প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়া। 

শোভার মধ্যে আমার চাহিদাগুলির অভাব ছিল। প্রসঙ্গের পরিবর্তন প্রয়োজন দেখে তার কলেজের আর পড়াশোনার বিষয় আলোচনা শুরু করি। কথার মধ্যে সত্যজিৎ রায় এসে পরলে আরো অবাক হলাম। শোভা সত্যজিৎ রায় কে চেনে না। মেনে নিলাম অনেকেই হয়ত জানে না। কিন্তু সুকুমার রায়? বাধ্য হয়েই আমি গুম মেরে গিয়েছিলাম। বেশ কিছুক্ষন কথা বন্ধ থাকায় সে জিজ্ঞেস করে সুকুমার রায় সম্পর্কে। কেমন যেন নিজের প্রতি নিজেকেই পরিহাস করতে ইচ্ছে হল। বলেছিলাম সুকুমার রায়ের সন্দেশ বানাবার কারখানা আছে। সত্যজিৎ রায় এখন সেই কারখানা চালায়। এবং কোন প্রতিবাদ ছাড়াই এটা বিশ্বাস করে নিয়েছিল শোভা। মা-এর পছন্দ সম্পর্কে সত্যি একটা তিক্ততা জন্ম নেয়। 

মধ্যাহ্ন ভোজের নিমন্ত্রণ থাকলেও চা ও জলখাবারে আজকের আলাপচারিতার ইতি রচনা করে পালিয়ে এসেছিলাম। ফেরার পরে মা-কে সব বুঝিয়ে বলেছিলাম। মা আমার সব কথা বেশ মন দিয়ে শুনলেন। তারপর উঠে ঘরের কোণে রাখা আলমারি থেকে একটা শাড়ি এনে আমার হাতে দিয়ে বলল, যে নক্সা করা  হয়েছে সুতো দিয়ে তার নাম বলতে। উত্তর দিতে পারিনি। শত্রূও বোধয় এইভাবে উপহাস করেনা, মা যেভাবে হেসেছিল। দুপুরে খেতে বসে পাতের ধারে একটু ক্ষীর দিয়েছিল মা। মুখে দিয়ে মনে হয়েছিল এখন আমি মরে গেলেও কোন আফসোস থাকবেনা। জীবনের সব থেকে সুখের খাওয়া আমি পেয়ে গিয়েছি। মা-কে সে কথা বলতেই মা ক্ষীর বানাবার পদ্ধতি জিজ্ঞেস করেছিল। এবারেও আমি উত্তর না দিতে পেরে মা-এর দিকে তাকিয়ে রইলাম। মা হেসে বলল ওই শাড়িতে সুতোর কাজ শোভা করেছে। এরকম অনেক সুতোর নক্সা করতে সে জানে। দুপুরে যে ক্ষীর খেয়ে আমি মরে গেলেও আফসোস থাকবেনা বলেছিলাম। সেই ক্ষীর, শোভা নিজে হাতে বানিয়েছে। 

"একটা মেয়ে সত্যজিৎ, সুকুমার কে চেনেনা বলে তুই যদি তাকে বাতিলের খাতায় ধরিস। ওই মেয়েটির সাপেক্ষে তাহলে তো তুই কিছুই জানিস না?"

কোন উত্তর আমার কাছে ছিল না। মাথা নিচু করে মা-এর ঘর থেকে বেরিয়ে  আসার সময় জানতে পারলাম। আগামী ডিসেম্বরেই আমার বিয়ে ঠিক করেছে মা। এবং শোভার সাথেই আমার বিয়ে দেবেন। প্রতিবাদ করিনি। 

                                                                           //৪//
বাবার ট্রাঙ্ক আর টেবিলের দেরাজ ঘেটে অনেক চিঠি আর খাতা পেয়েছি। বাবার যে লেখা-লিখির অভ্যেস ছিল জানতাম না। খাতার পাতাগুলোতে অনেক কাটাকুটি আর ছবি দেখে আন্দাজ পেয়েছিলাম এগুলো সাধারণ আঁকিবুকি নয়। বাবার লেখা গল্প। দুটো প্রায় ছিড়ে যাওয়া চিঠি থেকে জানতে পারলাম বাবার লেখা কলকাতার দুটো পত্রিকাতে ছাপানো হয়েছিল। বৈদিক যুগ সম্পর্কে বাবা যে একটা তথ্যচিত্র বানিয়েছিল আর সেটা যে সমালোচকদের কাছে পাঁচে তিন পেয়েছিল, একটি পত্রিকার কেটে রাখা অংশ পরে জানতে পারলাম। এইসব কাগজপত্র নাড়াচাড়া করতে গিয়ে একটা পুরোনো প্রায় হলদে ছাপ পরে নষ্ট হয়ে যাওয়া ছবি পেলাম। প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের সামনে বাবা দাঁড়িয়ে। বাবার এই চেহারাটাই আমার মনে আছে। স্যুট-বুট পরা, পরিপাটি করে আচড়ানো চুল। সত্যিই বাবাকে দেখলে একটা ইনস্পিরেশন কাজ করে যেন। 

কালীপুজোর সাতদিন আগেই আমরা চলে আসি। অনেক কাজ থাকে পুজোর আগে। সে'সব বন্দোবস্ত করতে হয়। হৈ-হুল্লোড় করে ভাই-বোনেরা মিলে  করেও ফেলি কাজগুলো। ঠিক পুজোর আগের দিন বাজার করে ফিরছি। সদর দরজার সামনে একটা বড় গাড়ি দেখতে পেলাম। ঠাকুর ঘরে দশকর্মার জিনিস গুছিয়ে রেখে ঠাকুমার ঘরে আসতেই দেখলাম এক ভদ্রলোক বসে আছেন। ঠাকুমা আমার দিকে তাকাতেই দেখলাম লোকটাও চেয়ারে পিছন ফিরে বসল। তারপর আমার দিকে ঠিক এক ভাবে এগিয়ে এলেন। স্কুলের ক্লাস টু-তে বাবা কে প্রথম দেখার দিনটা মনে পরে গেল। 

সেই টানটান সুঠাম চেহারা। ছ'ফিট লম্বা, এক মাথা কাঁচা-পাকা চুল। তবে আজকে স্যুট-বুট ছিল না। লোকটা আমার কাছে এসে কিছুক্ষন এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। তারপর হাত বাড়িয়ে দিলেন হ্যান্ডশেক করবার জন্যে। "হ্যালো ইয়ং ম্যান। কেমন আছো?"


গতবারের ঘটনাটা বাবার বোধয় মনে ছিল। তাই বেশ সুন্দর ভাবেই নিজের আবেগকে গুছিয়ে নিয়ে হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে প্রাথমিক আলাপ পর্বটা মিটিয়ে ফেললেন। 

                                                                     //৫//

১২ই মার্চ, ১৯৬৪

শোভার সাথে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। গত এক বছরে আমার ব্যাবসা অনেকগুলি ঝড় সামলে এখন ধুঁকছে। সরকারের নিত্য নতুন নীতি প্রয়োগ, আর কাঁচামালের ওপর কর বাড়ানোর ধাক্কা সামলাতে গিয়ে লাভের হিসেব ভুলেই গিয়েছি প্রায়। তার ওপর লেবার ইউনিয়নের নিত্য নতুন দাবী আর হাল ফ্যাশনের ধর্মঘট সামলাতে গিয়ে নাজেহাল অবস্থা। মা এ'সব ব্যাপারে বোঝে না। আমার বাকি ছোটখাটো কারবারের অংশীদারেরাও নিজেদের পথ বেছে নিয়েছে। একটা গোটা জাতি শুধুমাত্র পরের গোলামী করেই কাটিয়ে দিল। স্বাধীন ভাবে ব্যাবসা করব বলে সামান্য পুঁজি নিয়ে নেমেছিলাম। আজ প্রায় শূন্য মূলধন থেকে কয়েক লক্ষ টাকার এই কারখানা, জমি সব বিক্রী করে দিতে হবে হয়ত। শ্রমিক শ্রেণীটাই মূর্খ। দুবেলা খাবার জোটেনা, পরনে কারখানার ইউনিফর্ম ছাড়া পোষাক জোটেনা। এদিকে ট্রেড ইউনিয়নের নেতার কথায় মালিককেই শত্রূ বানিয়ে ধর্ণা দিচ্ছে। আমি সত্যি আর পারছিনা ধকল সামলাতে। এদিকে শোভা সন্তান সম্ভবা। আমি বাপ্ হতে চলেছি, আর শিশু জন্মে দেখবে তার ভিখিরি বাপকে। 

না। আমি পারব না। আমি নিজে অনেক কষ্ট করেছি। বাবার অক্ষমতাকে বুঝে পরিস্থিতি কে মেনে নিয়েছি। কিন্তু শোভা বা আমাদের সন্তানকে আমি সেই কষ্ট পেতে দেবনা। শোভা তো আমার আর আমার মা এর মুখ চেয়ে এই সংসারে এসেছে। তাকে কষ্ট দেবার কোন অধিকার আমার নেই। এই ক'বছরে আমাদের মধ্যে ঘনিষ্টতা কিছুটা বেড়েছে। যে দূরত্ব আমি বজায় রাখতাম, তার পরিমিতি সীমিত হয়ে এখন আমরা নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পরলাম। শোভা আমায় একটি সন্তান উপহার দিতে চলেছে। আর ঠিক এই সময়েই শুরু হল কারখানায় গোলযোগ। বাজারে অনেক টাকা আটকে রয়েছে, অংশীদারেরা নিজেদের ভাগ টেনে নিয়ে সরে গেছে। দেনার দায়ে লাভের টাকা দিয়ে সুদ গুনতে হয়। শ্রমিকদের কাছে অনেকবার বুঝিয়ে বলেও কোন সুফল না হওয়ায় উলুবেড়িয়া আর সোনারপুরের দুটো ইউনিট আমার বিকল হয়ে পরে রয়েছে। শ্রমিক ধর্মঘটে আমার নিজের কারখানায় তালা ঝুলিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি। একটা আশ্রয়ের প্রয়োজন এখন আমার। মেজকাকুর সময় আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার সময় তো কেউ নেই? 


শোভার কাছে একদিন বলেই ফেললাম সব। কোন সমাধান সূত্র পাওয়ার বদলে একটাই কথা শুনলাম। "ঠাকুর সব ঠিক করে দেবেন। ধৈর্য ধর।  সব ঠিক হয়ে যাবে।"

কারখানার দরজায় যে তালা ঝুলছে, ঠাকুর যে কিভাবে সেই তালা খুলে দিয়ে যাবেন আমি জানি না। কাজ বন্ধ থাকার জন্যে যে পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি আমার হচ্ছে রোজ ,তার ক্ষতিপূরণ ঠাকুর কিভাবে করে দেবেন আমি জানি না। মদ আমার ধাতে সইত না। একা একা যুদ্ধ করতে গিয়ে আমি ক্রমে সেই দিকেই ঝুকে পরলাম। মা অবশ্য জানেনা। কিন্তু শোভা অপ্রস্তুত হয়ে পরত আমায় দেখে। নিজের আস্তানা গুটিয়ে তাই আমার ছেলেবেলার চিলেকোঠার ঘরে চলে এসেছি। আমার যুদ্ধের কি কোন অবসান নেই? এত সুন্দর করে সাজিয়েছিলাম আমার স্বপ্নকে। আজ সব কিছু নষ্ট হয়ে যাওয়ার মুখে। আমার সত্যিই আর এখানে থাকতে ভালো লাগছে না। 

                                                                        //৬//
রান্নাঘরে পিসির কাছে গিয়ে জানতে পারলাম বাবা এখন থেকে এখানেই থাকবেন বলে এসেছে। নিজের সব জিনিসপত্র নিয়েই এসেছেন তাই। কাউকে উপদ্রব করবে না। নিজের চিলেকোঠার ঘরেই থাকবে। এমন সময় মা ডেকে পাঠানোয় বাবার ফিরে আসার কারণটা জানা হয়নি।

বেশ মজলিশী লোক ছিল বাবা। প্রবাসীদের মধ্যে বোধয় একটা স্বভাবগত পরিবর্তন এসে যায়। টুকরো বিষয়গুলো কে সামান্য বলে এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা থাকে বেশি। পিসি এবং মা এর ভগ্নিপতিদের কটাক্ষ কিছু তাই খুব নিখুঁত ভাবে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল বাবা। অবসর সময়গুলোতে বাচ্চাদের সাথে নানা রকম খেলায় কাটিয়ে দিল বাবা। তাসের ম্যাজিক, জাগলিং, আরো কত রকম খেলা। বাবা কে আমি সত্যিই এইভাবে চেনার সুযোগ পাইনি। খুব ইচ্ছে করছিল, ছেলেবেলা থেকে পাওনা আদরগুলি আদায় করে নিতে। ইচ্ছে করছিল এতদিনের নিরুদ্দেশ থাকার কারণ গুলো জানতে। কিন্তু কোথাও যেন একটা আড়ষ্টতা আমার পরিধিকে বেড়া দিয়ে রেখেছিল।

আর পাঁচজন এন্টারটেইনারকে যেভাবে দেখি, বাবাকেও সেইভাবে দেখতে কষ্ট হচ্ছিল খুব। কিন্তু মা-এর চোখের জলগুলি মনে পরে যাওয়ায় সেই ইচ্ছেকে মুলতুবি করে দিয়েছিলাম। রাত্রে যখন পুজো হচ্ছে বাবা একটা ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী আর ধুতি পরে এসে দাঁড়িয়েছিল মন্ডপের এক কোণে। মেজদাদু মারা যাওয়ার পর থেকে আমাকেই পুজোর কাজে যোগ দিতে হয়। যজ্ঞের সময় পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করতে হয়। বাবার দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে দেখেছিলাম। বাবার ঠোঁটের কোণে একটা হাসি। মন্ডপের ধারের আলো-আঁধারি আর যজ্ঞের আগুনের কম্পমান শিখার আলোয় বাবার চেহারার সাথে নিজের সাদৃশ্যগুলি খুঁজে পাচ্ছিলাম একটু একটু যেন।

পুজো শেষ হয়ে যাওয়ার পরে বাবা নিজের ঘরে চলে গিয়েছিলেন। ছাতে উঠে বাবার ঘরের সামনে গিয়ে দেখি বাবা ঘুমোচ্ছে। মনের মধ্যে জমে থাকা কথাগুলিকে আবার বাক্সবন্দী করে ফিরে এসেছিলাম।

পরের দিন ভাসানের সময় আবার বাবাকে দেখলাম। এক রাতেই চেহারাটা  যেন অনেকখানি ভেঙে গেছে। একবার মুখ ফস্কে বলেও ফেলেছিলাম, "বাবা তোমার কি শরীরটা খারাপ?" বাবা বোধয় আন্দাজ করেছিল আমি কিছু বলতে চাই। কাছে এসে জিজ্ঞেস করেছিল, "কিছু বলবে?"
দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করেছিলাম, "আপনার এখানে কোন অসুবিধা হচ্ছেনা তো?"

বাবা একটু হেসে উত্তর দিয়েছিল, "কোন প্রয়োজনে তোমাকেই আগে বলব।"

                                                                  //৭//
১৯শে এপ্রিল, ১৯৭২

শিবুর কাছে খবর পেয়ে সোজা চলে এলাম দার্জিলিং। মেজকাকুর কাছে খবর পেয়েছিলাম আমার ছেলে হয়েছে। শোভা সুস্থ আছে সেই খবরও জানিয়েছিলেন। ইচ্ছে করছিল ছুটে যেতে। কিন্তু কাজের জন্যে সম্ভব হয়নি। বহু কষ্টে কারখানা বিক্রি করে দেনা মুক্ত হয়েছিলাম। বাকি টাকা মেজকাকুর নামে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম শোভা আর আমার ছেলের জন্যে। একরকম বাধ্য হয়েই আবার দেশ ছাড়লাম। বড্ড দলাদলি আর মারামারি যেখানে। ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ীদের আয়ু সেই দেশে কমে যায়। ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে একটা পত্রিকা অফিসে সিকিউরিটির কাজে চাকরি পেয়ে যাই। তারপর টাকা জমিয়ে চলে আসি ব্রাসেল শহরে। ইউরোপে এসে দেখলাম টাকা রোজগারের একটা সহজ উপায় ট্যুর গাইড করে। পড়াশোনা করে সেই কাজ জুটিয়ে নিলাম। গোটা ইউরোপ ভ্রমণ হয়ে গেল আমার। এদিকে দু'পয়সা রোজগার ও হয়ে গেল। 

স্পেন এ এসে এক ভারতীয়র পাল্লায় পরে ঘড়ির ব্যাবসা শুরু করে দিলাম। সেই সূত্রেই ভারতে আসা। শোভা হয়ত ঠিক বলেছিল।"নতুন দরজা খুলবে বলেই পুরোনো দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যায়।" আমার ঘড়ির কারবার জমে ওঠে। সাউথ আফ্রিকা সহ পাঁচটি দেশে এখন আমার এজেন্সি আছে। কাজের সূত্রেই বম্বে এসেছিলাম। আর সেখানেই শিবুর সাথে দেখা। শিবু সম্পর্কে আমার শ্যালক, শোভার খুড়তুতো ভাই। আমার ছেলের নাম নৃপেন্দ্র। দৌড়াত্বের দিক দিয়ে তার জুড়ি মেলা ভার। তার অত্যাচারে একরকম বাধ্য হয়েই শোভা তাকে দার্জিলিঙের একটি বোর্ডিং   স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। শোভা নিজেও একটি স্কুলে চাকরি করছে আর মেজকাকুর ব্যাবসা সামলাচ্ছে। 

পৈতে হওয়ার সময় আমার পূর্ব-পুরুষদের নাম মুখস্ত করেছিলাম। নৃপেন্দ্র মোহন আমার ঠাকুরদাদার ঠাকুরদা। নবদ্বীপের রাজ দরবারে একটা তর্ক সভায় 'পঞ্চানন' উপাধি পেয়েছিলেন। বয়সকালেও ওনার শিশুসুলভ দৌরাত্ব আর রসিকতার মাধ্যমে অকাট্য যুক্তি প্রদর্শনে তার জুড়ি মেলা ভার। রাজা তাই খুশি হয়ে নৃপেন্দ্রকে কিশোর বলে ডাকতেন। সেই থেকে আমাদের নামের মাঝে কিশোর আসে। আমাদের প্ৰ প্ৰ পিতামহের ডাক নাম সেই থেকে আমাদের বংশে ব্যাবহার হয়ে এসেছে। সেই নৃপেন্দ্র কিশোরের নাম পেয়েছে আমার ছেলে। এতদিনের সুপ্ত আগ্রহ যেন বাঁধ ভেঙে প্লাবন ডেকে আনে। 

মেজকাকু মারা গিয়েছেন শুনে নিজের সব যোগসূত্রের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে ফেলেছি মনে হয়। ইচ্ছে করছিল মা-এর কাছে ছুটে যেতে। শোভার কাছে গিয়ে আত্মসমর্পন করে ক্ষমা চেয়ে নিতে। কিন্তু সেই সব ইচ্ছেকেও ছাপিয়ে নৃপেন্দ্রকে দেখার আবেগ আমায় আবদ্ধ করে ফেলেছিল। 

শিবু অবশ্য আমায় সাহায্য করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমার পাঠানো টাকা সে তার দিদির হাতে দিয়ে আসবে। গোপনীয়তা বজায় রাখবে বলেও কথা দিয়েছে। আর আমি যে তার কাছে খবর পেয়ে নৃপেন্দ্রকে দেখতে এসেছি, সেই খবর ও সে জানাবে না। 

প্রিন্সিপাল ফাদার স্ট্যানলির কাছে নিজের পরিচয় দিতে উনি আমার সব কথা শোনেন। তারপর একটি বেয়ারাকে দিয়ে নৃপেন্দ্রকে ডেকে পাঠান। কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর প্রিন্সিপাল ঘরের দরজা দিয়ে যে বাচ্ছাটি এসে দাঁড়ালো। তাকে দেখে নিজেই নিজেকে বিশ্বাস করতে পারিনি। অবিকল নিজের প্রতিকৃতি যেন ত্রিশ বছর এক লাফে পিছিয়ে দরজার সামনে মূর্ত প্রতিফলন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার এই বয়স থেকেই চিনেছিলাম অভাব কি জিনিস। জেনেছিলাম হেঁসেলে কিচ্ছু না থাকলে জল ঢালা ভাত নুন দিয়ে খেতে। বিকেলে বন্ধুর ঘরে রুটি-তরকারি দিয়ে টিফিন হলে বাড়ি গিয়ে স্কুলের পড়া নিয়ে বসে যেতাম খিদে ভোলাবার জন্যে। আমার অবিকল প্রতিকৃতি আমার সামনে দাঁড়িয়ে। নিজের ছেলেবেলাকে আলিঙ্গন করতে কে না চায়। নৃপেন্দ্রকে টেনে নিয়েছিলাম আমার বুকে। নরম একটা উষ্ণ শরীর আমার দুহাতের মাঝে। ওর বুকে কান রেখে শুনলাম ওর হৃদপিণ্ডের স্পন্দন। আর অনুভব করলাম নিজের রক্তবাহে বয়ে যাওয়া স্রোত। 

নৃপেন্দ্র আমায় চিনতে পারেনি। স্বার্থপরের মত কেবল নিজের কথাই ভেবে এসেছি এতদিন। ওর জন্মের সময় মেজকাকু বারবার বলেছিলেন ফিরে আসতে। আমিই জেদ ধরে ছিলাম। খুব অন্যায় করে ফেলেছি। শোভার প্রতি করা অন্যায় আজ আমার এই কষ্টের কারণ। 

                                                                         //৮//
পুজো শেষ। পরেরদিন বিকেলে ভাসান হবে। তার আগে মন্ডপের বাইরে চাতালে, ঢাকের তালে ধুনুচি নাচ হল। বাবা ঢাক বাজাল, ধুনুচি নিয়ে মা কালীর সামনে আরতিও দিল। তারপর চারদিক থেকে একসাথে রব উঠল.... "বলো কালী মা-য় -কি............  জয়য়য়।" মা কালীর মূর্তি তুলে নিয়ে যাওয়া হবে কাছেই পুকুরপাড় অব্দি। বাবা-ও এসে যোগ দিল আমাদের সাথে। পুকুর পার অব্দি গিয়ে মূর্তিকে সাতপাক ঘোরাতে হয়। এই সময় অনেকে হাফিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেয়। প্রতিবারেই আমি শেষ অব্দি টিকে থাকি। এবারে আমি আর বাবা। চতুর্দিকে শাঁখের আওয়াজ আর উলুধ্বনি। পুকুর পার থেকে একটা হিমেল হাওয়া এসে মুখে ঝাপ্টা দিয়ে যাচ্ছে। মূর্তির একপাশে আমি আর অন্যপাশে বাবা। বাবার পাঞ্জাবিটা ঘামে ভিজে জবজবে। আমিও ঘেমে গেছি। ঠান্ডা হাওয়ায় বেশ একটা  শৈত্য ভাব আছে। রব উঠল "বলো কালী মা-য়-কি.........."

"ঝপাস!" উলুরধ্বনি আর শাঁখের শব্দে চারিদিক গমগম করছে। জলের মধ্যে একটু একটু করে হারিয়ে যাওয়া মূর্তির দিকে তাকিয়ে আছি। অনুভব করলাম আমার কাঁধে কেউ যেন হাত রাখল। ফিরে দেখি বাবা। মুখে সেই হাসিটা। আঁকড়ে ধরলাম বাবাকে। আমিও আজ বাবার মতোই লম্বা। বাবার মত করেই পরিপাটি চুল আচরাই। চোখের কোণ দুটো যেন আপনা থেকেই ভরে উঠল। সত্যি বড় বিচিত্র মানুষের মনের অভিব্যক্তি। আমার এতদিনের জমানো ক্ষোভ, অভিযোগ, যা ব্যক্ত করব ভেবেছিলাম ভাষার মাধ্যমে, কিছু কড়া প্রশ্নবানে বাবাকে জর্জরিত করার মাধ্যমে। সব পরিকল্পনা যেন উত্তাপে বাষ্পীভূত হয়ে যায় আর, বৃষ্টি হয়ে ঝরে পরে দুচোখের কোল বেয়ে।

"কেন আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলে বাবা?"

ঘামে ভেজা ঠান্ডা শরীরটা আমার ওপর ভর দিয়ে। কোন উত্তর নেই দেখে নিজেকে একটু অবসর করার চেষ্টা করতেই বাবার শরীরটা লুটিয়ে পড়ল পুকুর পারে। নিষ্প্রাণ দেহটাকে বার কয়েক ধাক্কা দিলাম। এতদিন ধরে যার অস্তিত্ব জেনে এসেও সান্নিধ্য পাইনি। সেই বাবাকে এত কাছে পেয়েও হারিয়ে ফেললাম অবহেলায়। বাবা চলে গেল আমাদের ফেলে। বাবাকে না পাওয়ার আফসোসটা আরো বেশী করে মনে হয়। সেদিন স্কুলে বাবাকে দেখে যদি পালিয়ে না যেতাম; বাবা হয়ত আমার টানেই বাড়ি ফিরে আসত।


                                                                        //৯//
বাবার শ্রাদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়েছে। ঠাকুমা এখন একেবারেই নীরব। বাবা এতদিন বাড়িতে থাকতনা ঠিকই।  কিন্তু ছেলের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস যে তার প্রতিটি হৃদ্স্পন্দন, এতো আর বলার অবকাশ রাখে না। ছেলের মৃত্যুতে এখন তাই ঠাকুমা আরো চুপ করে গেছেন। পুজোয় আসার পরে বাবা নিজের চিলেকোঠার ঘরেই উঠেছিল। বাবার অফিস বা ব্যাবসা সম্পর্কিত লোকজনের কাছে শোক-সংবাদটা দেবার উদ্দেশ্যে বাবার ঘরে এসেছিলাম। ডায়রি, খাতা-পত্র ঘেটে কারুর ঠিকানা বা ফোন নম্বর যদি পাওয়া যায়। কিন্তু যা পেলাম তা একগুচ্ছ ইতিহাস।

মা-এর ঘরে এসে দেখি মা জালনার ধারে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে বুঝলাম হাতে ফোনের রিসিভারটা। কাঁধে হাত রাখতেই মা সচেতন হয়ে আঁচল দিয়ে চোখ মুছে নেয়।

"কে ফোন করেছিল?"

"তোর শিবু মামা।"

"কোন খারাপ খবর না-কি?"

"না, কলকাতা ফিরলে তোকে আর আমাকে দেখা করতে বলেছে।"

"কেন? আর তোমার হাতে ওটা কি?" মা-এর হাতে কাগজটা ঘরে ঢোকার সময়ই লক্ষ্য করেছিলাম।

"কিছুনা। তুই তোর ঠাকুমার কাছে যা একবার। shock পেয়েছেন। তোর এখন সাথে থাকা উচিত।"

ঘর থেকে বেরিয়ে যায় মা। শিবু মামা ফোনে কি বলেছে হয়ত আন্দাজ করতেই পারছি। ডায়রিগুলো পড়ে সেটুকু ধারণা করে নেওয়া যায়। আর মা-এর হাতের কাগজটা যে বাবার লেখা প্রথম এবং শেষ চিঠি। সেটা বুঝেই মা-কে আর বিরক্ত করলাম না।




 -------------------------------------------------------সমাপ্ত--------------------------------------------------------





গল্পের সব চরিত্র কাল্পনিক। বাস্তবে কারো সাথে কোন ঘটনার মিল সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয়। 

সহকারী: আগন্তুক। 
 কৃতজ্ঞতা স্বীকার: Google images .AhD 







সোমবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৭


প্রথম কিস্তি 



                                                                           //১//
ঘরে ঢুকেই সামনে থাকা সোফা-সেট এর একটায় বসে পরেন সৌগত মল্লিক। কোটের বাম পকেট থেকে রুমাল বার করে কপালের ঘাম মুছে নিয়ে, বার কতক বড় বড় শ্বাস ফেলে ধাতস্ত হন খানিকটা।

"আপনার কি শরীর খারাপ নাকি?" ছাইদানিতে সিগারেটের অবশিষ্ট অংশ টুকু ফেলে প্রশ্ন করে শচীন।

"আপনিই শচীন সামন্ত?" আরেকবার কপাল আর ঘারের ঘাম মুছে নিয়ে রুমালটা পকেটে রাখেন সৌগত বাবু।

"আজ্ঞে হ্যা! আমি।" এক গ্লাস জল মল্লিক বাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে নিজের জায়গায় গিয়ে বসে শচীন।

"বলুন কি সমস্যা?"

"বাপরে বাপ্! এমন জায়গায় বাড়ি আপনার, খুঁজে পেতেই এক ঘন্টা লেগে গেল। বড় রাস্তার কাছে একটা চেম্বার করলে পারেন তো?" গ্লাসের জল টুকু শেষ করে টেবিলে নামিয়ে রাখেন সৌগত মল্লিক।

"কি-আর করি বলুন। আমার মক্কেলরা বড়লোক হলেও, আমি তো নোই।" নিজের চিরাচরিত তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে সোফায় আরো আরাম করে হেলান দিয়ে বসে শচীন।

"আপনার কাছে একটা সিগারেট হবে? আমার প্যাকেটটা বোধয় গাড়িতে ফেলে এসেছি।"

"নিশ্চই!" Goldflake এর বাক্সটা এগিয়ে দেয় শচীন।

সিগারেট ধরিয়ে পরপর দুটান দিয়ে একরাশ ধোয়া ছেড়ে কথা শুরু করেন আমাদের আজকের মক্কেল সৌগত মল্লিক।


"Calcutta Club এর অনির্বাণ দাসগুপ্ত আপনার নম্বর দিয়েছিলেন আমায়। উনি আপনাকে কিছু বলেছেন?"

"Text করে আপনার পরিচয়, আর আজকে আসার কথা জানিয়েছিলেন। ব্যাস! আর কিছু নয়।"

"ওহ!" আরো বার দুয়েক টান দিয়ে সিগারেটটা ashtray তে ফেলে দেন মল্লিক বাবু।

"অনির্বাণের কাছে আপনার যা বর্ননা শুনেছিলাম, তার সাথে যদিও কোন মিল খুঁজে পাচ্ছি না। আপনিই শচীন সামন্ত তো?"

"বিলেত যাওয়ার কোন ইচ্ছে বা সম্ভাবনা নেই বলে passport করিনি। গণতন্ত্রিক দেশে বাস করি বলে কোনদিন মনে হয়নি বলে, voter card ও করিনি। আর কাজের সূত্রে বাইরে থাকি বেশি বলে AADHAR card ও করানো হয়নি। এ`বার আমাকে বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সম্পূর্ণ আপনার ইচ্ছে!"

"আমার পরিস্থিতিতে থাকলে, আপনিও চট করে সবাইকে বিশ্বাস করতে পারতেননা মশাই।"

"গাড়িতে যে কুকুরটিকে রেখে এসেছেন, সে আবার পাড়া মাতিয়ে চিৎকার শুরু করে দেবে না তো?"

"কুকুর?"

"আপনার কোটের আস্তিনে যার লোম এখনো লেগে রয়েছে।"

কোটের আস্তিন পরীক্ষা করে লোম দেখে হেসে ফেলেন সৌগত মল্লিক।

"Lucy আমার দু`বছরের একটা লাব্রাডর। এখন সে-ই আমার সব থেকে বিশ্বস্ত শচীন বাবু।" কোটটা খুলে হাতে নিয়ে বসেন সৌগত বাবু। "আপনি চিন্তা করবেন না। গাড়িতে সে দিব্য আরামেই রয়েছে।"

"আপনার showroom তো বালিগঞ্জে? বাসে করে কোথাও গিয়েছিলেন?"

"আজ্ঞে?" একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন সৌগত বাবু।

"আমার পাড়ায় এসে রতনের দোকানে চা-বিস্কুট খেলেন। আমার নাম বলেও কোন লাভ না হওয়ায়, instruction মত গলির মুখে তিন নম্বর বাড়ি হিসেব করে তারপর এলেন।"


"বাবাঃ! আপনিতো পাকা গোয়েন্দাদের মত কথা বলছেন দেখছি।"

"পেশাটা এক না হলেও, অভ্যেসগুলো তো একরকম রাখতেই হয়, না!" আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে সৌগত বাবুর দিকেও একটা সিগারেট বাড়িয়ে দেয় শচীন।

"ডাক্তার আপনার pressure এর ওষুধ পাল্টেছেন, blood test ও দিয়েছেন, কিন্তু করানো হচ্ছে না!"

"কি করে বলছেন বলুন তো? আমি গোয়েন্দা গল্প পড়েছি অনেক, কিন্তু?"

"অল্প বয়সে বাসে ট্রামে চড়ার অভ্যেস ছিল বোধয়। ticket নিয়ে হাতে ঘড়ির band এর নিচে রাখা দেখে আন্দাজ করলাম বাসে উঠেছিলেন। রতনের দোকানে চা খেয়েছেন বুঝলাম আঙুলে লেগে থাকা মাটির ভাঁড়ের ধুলো দেখে। আর চা বোধয় গরম ছিল, প্রথম চুমুকে ছ্যাকা লাগায় সামান্য চা shirt এ পরে। তার দাগ দেখা যাচ্ছে আপনার জামায়। আর বিস্কুটের কিছু গুঁড়ো এখনো লেগে আছে ঠোঁটের কোনায়। রতনের দোকান বুঝলাম দাগগুলো এখনো বেশ টাটকা রয়েছে দেখে। পুরোনো হলে আঙুলে মাটির ভাঁড়ের ধুলো থাকতো না। আর এই পাড়ায় একমাত্র রতনের দোকানেই ভাঁড় চালু আছে।  Pressure এর ওষুধের বেপারটা আন্দাজ করলাম আপনার গোড়ালির কাছে ফোলা দেখে। ইডিমা হয়ে আছে।"

"না মশাই, ফেলুদা আমিও পড়েছি। তবে application টা এমনভাবে চাক্ষুস করিনি কোনদিন।"

"এবার আপনার সমস্যার কথা শুনি?"


                                                                 //২//
পাঠকদের সুবিধার্তে আলাপ পর্বটা এইবেলা সেরে ফেলি। আমি সুবীর গাঙ্গুলী আর শচীন আমার বাল্যবন্ধু। দুজনেই একসাথে ডাক্তারি পড়েছিলাম, কিন্তু পেশাদারিত্বে অপটু এবং অযোগ্য প্রমাণ হওয়ায়, ডাক্তারি ছেড়ে স্বাধীন ব্যবসা শুরু করেছি। ব্যবসাটা কি, সেটা গল্পের প্রবাহের সাথেই জানতে পারবেন। আমাদের আজকের মক্কেল সৌগত মল্লিক, কলকাতার নামকরা মল্লিক এন্ড সন্স এর মালিক। পৈতৃক ব্যবসায় এসে সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় আজ এই জায়গায় নিয়ে আসতে পেরেছেন।

মল্লিকবাবু phone এ যা বলেছিলেন, তার সারাংশ করলে যা দাঁড়ায়। গত তিন বছর যাবৎ পারিবারিক একটি বিষয়ে উনি বাজে ভাবে জড়িয়ে পড়েছেন। যার থেকে মুক্তি পাওয়া খুবই জরুরি, এবং সেটা গোপনীয়তার সাথে হলেই সবচেয়ে ভালো। নিজের যে পরিচয় বাজারে এখন তৈরী হয়েছে, তার ওপর কালিমা মাখলে ব্যবসার অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।

আমি আর শচীন এ রকম বিপাকে পরে যাওয়া মানুষদের উদ্ধার করি, বা উদ্ধার হতে সাহায্য করি। একটা সূত্র দিয়ে রাখি, পেশার প্রয়োজনেই আমাদের দুজনের আসল নাম প্রকাশ পায়না। গল্পের প্রয়োজনেও সেটা গোপন থাকে?

"আমার স্ত্রীকে নিয়ে সমস্যা।" Flask থেকে গরম চা দিয়ে গেছে কেষ্ট। কাপে চুমুক দিয়ে আবার টেবিল রেখে বলতে শুরু করেন মল্লিক বাবু।

"নির্মলার সাথে আমার আলাপ হয় আমাদের ad agency মারফত। একটা product launch এর সময় কিছু model এর প্রয়োজন ছিল। নির্মলা সেখানে audition দেয়। কি দেখেছিলাম কে জানে, হয়ত যুবা বয়সের উৎসাহেই নির্মলাকে select করতে বলি আমি। তারপর কিছু ভুল করে ফেলি আর যে কারণে। ..."

"প্রথম স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদ এবং নির্মলার সাথে বিবাহ?"

"অনির্বাণ বলেছে আপনাকে?"

"উনি নিজেও জানেন কিনা আমি জানি না।"

"হুমম! ব্যাপারটা আড়ালে মিটিয়ে নেওয়া হয়। "

"নির্মলা দেবী আপনাকে blackmail করতে শুরু করেন, এবং তার সহকারী যে ছিল সেই সময় এই কাজে, এখন নতুন দাবী নিয়ে আপনাকে বিরক্ত করতে শুরু করেছে।"

"আজ্ঞে হ্যা! রাকেশ যাদব নামের একজন। আমার স্ত্রীর কলেজ জীবনের প্রেমিক। ওদের মধ্যে যে সম্পর্কটা এখনো রয়েছে তার প্রমাণ পেয়েছি গত বছর। রাকেশ এখন আমার ব্যবসার অর্ধেক মালিকানা চায়। নির্মলা তাকে সেই কাজে সাহায্য করছে।"

"নতুন দাবীর জন্যে এই রাকেশ আর নির্মলা কি বিষয়ে আপনাকে blackmail করেছে?"

"আমাদের পারিবারিক সোনার ব্যবসা এখন যে পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, বুঝতেই পারছেন, সোজা পথে সবকিছু হয়নি।"

"আর সেই অন্ধকার দিকের হদিশ রাকেশ পেল কিভাবে?"

"নির্মলার প্রতি আমার একটাই দুর্বলতা ছিল, তার শরীর। আর সেই ফাঁদেই পা দিয়ে আমি অনেক কথা বলে ফেলেছি তার কাছে। এখন আফসোস হয় নিজের অল্পবয়সের খামখেয়ালি গুলোর কথা ভাবলে।"

"Income tax এ ফাঁকি দেয়া থেকে শুরু করে, গোপনে সোনার কারবার চালানো, এই সবকিছুর প্রমান তাদের হাতে এসে গেছে?"

"আপনি আমায় বাঁচান শচীন বাবু। আমার বাবা সত্তোরোর্ধ বৃদ্ধ। আমার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর এক সন্তান আছে। সে-ও এখন বড় হয়েছে, বুঝতে শিখেছে। আমার আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোন পথ নেই। পুলিশে ওপর মহলে আমার চেনা শোনা আছে। আপনি চাইলেই আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারি। কিন্তু এই বিপদ থেকে আমায় উদ্ধার করুন।"

"তাহলে পুলিশের সাহায্যই নিতে পারতেন। ব্যাপারটা সরকারি শিলমোহর পেত ?"

"ক্ষমা করবেন। আমি ভুল করে বলে ফেলেছি।"

"সুবীর আপনাকে একটা mobile দিয়ে দেবে। 'শরীরের' লোভে সেটি আবার শত্রূপক্ষের হাতে তুলে দেবেন না। আজকের পর থেকে আমাদের সব কথা এই mobile মারফত হবে। আর কাজ ফুরিয়ে গেলে mobile টা ফেরত দিয়ে দেবেন।"

"নিশ্চই"

"আগামী পরশু রাত সাড়ে নটা নাগাদ আপনার কাছে call যাবে। চেষ্টা করবেন সেই সময় শত্রূ সীমার বাইরে আর পরিষেবা সীমার মধ্যে থাকার।"

"বেশ বেশ! আর আপনার mode of payment টা ?"

"সবটাই cash এ হবে, আর এখন বারো হাজার টাকা advance দিয়ে যেতে হবে।"

"মোটামুটি আন্দাজ কিরকম খরচ পরবে?"

"আপনিই আন্দাজ করুন না! দেখি অঙ্কটা মেলে কি-না?"

"সত্যিই যদি আপনি success পান Mr. সামন্ত। Am ready to pay you any amount."

"বাহ্! তাহলে তো মশাই আপনাকে আমারও blackmail করার একটা সুযোগ আছে দেখছি।"

সমবেত তিনজনেই হেসে ওঠে শচীনের কথায়।

"আপনি ঠাট্টা ভালোই করেন Mr. সামন্ত। Seriously. আপনি নিজের প্রয়োজন মাফিক সমস্ত খরচ পেয়ে যাবেন। কিন্তু আমার কাজটা ঠিক মত হয়ে যাওয়া চাই।"

আরো টুকটাক কাজের কথা হলে, দ্বিতীয়বার চা-পর্ব শেষ করে ভদ্রলোক বেরিয়ে যান। দু'হাজার টাকার ছ'টা নোট সঙ্গে নিয়ে আমিও বেরিয়ে যাই খুচরো করিয়ে আনতে। আমাদের কাজে, লোকে নিজের রোজগারের টাকা কম দেন, বদলে কালো টাকাগুলি চালিয়ে নেন বেশি।

                                                                            //৩//
প্রায় সাতটা দোকান ঘুরে এক এক জায়গায় একটা করে নোট ভাঙিয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম, শচীন সোফায় আধশোয়া অবস্থাতেই ঘুমিয়ে গেছে। বিরক্ত না-করে তার ঘরে ঢুকে, টাকাগুলো নিয়ম মাফিক জায়গায় সাজিয়ে স্নান-খাওয়া সেরে নিলাম। এ'বার কলকাতায় মাত্রাতিরিক্ত গরম পড়েছে। বাড়ি থেকে বেরোতেই অভক্তি আসে। শচীন আবার খুচরো কাজ করতে ভালোবাসে না। তাই এ'সব দিকগুলো আমাকেই সামলাতে হয়। আর কেষ্ট আমাদের পরিত্রাতা। সময়মত খাবার আর চা-এর যোগান থেকে শুরু করে laundry থেকে কাপড় আনা। একেবারে গুছিয়ে করে দেয়। আমি আসার পর থেকে শচীনের আলসেমি আরো বেড়ে গেছে। আগে তবু নিজে সিগারেট কিনতে যেত। এখন সেটাও আমার দায়িত্বে।

পোশাক পাল্টে আলো নিভিয়ে শুয়ে আজকের case টা নিয়ে ভাবছি, এমন সময় মাথার কাছে একটা ছায়া দেখে চমকে উঠলাম। অন্ধকারে কোন অবসরে শচীন যে আমার মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি।

"ঘুমিয়ে গেলে চলবে?" ঘরের বাতি জ্বালিয়ে আমার laptop টা নিয়ে আসে।

"বাহ! নিজে নাক ডাকিয়ে পাড়া কাপালে এতক্ষন?"

"ভদ্রলোক চুটিয়ে facebook করেন।"

"কি ভাবে বুঝলে?"

"কথা বলার সময় ওনার mobile এর fb messenger এর পিড়িং পিড়িং আওয়াজ শুনে। এই নাও।"

laptop টা আমার দিকে বাড়িয়ে দেয় শচীন।


"ওনার profile টা hack করে দিয়েছি। এবার নির্মলা মল্লিক, আর রাকেশ রাজু, এই দুজনের ছবিগুলো পটাপট save করে নাও। তারপর print করে নাও।"

"বেশ! তারপর?"

"আমার কাজের জায়গা, আর পদ্ধতি সম্পর্কে একটা খসড়া বানানো হয়ে গেছে। কাল থেকে নেমে যাবো।"

"বা বা এর মধ্যেই?"

"সামান্য কাজে বেশি সময় নষ্ট করে লাভ কি বল?"

"সামান্য? আমার তো মনে হয় ভালোই কাঠ-খড় পোড়াতে হবে এই কাজে।"

"কাঠ-খড় পুড়িয়ে রান্নাও করা যায়, মরাও পোড়ানো যায়। এই কাজে রান্নার মতো কাঠ-খড় জোগাড় হলেই হবে। "

" কোথায় যাওয়া হবে, সেটা বলবে?"

"কাল রাতে সব বলব। এখন কাজগুলো সেরে ঘুমিয়ে পর।"

                                                                   //4//

শচীনের সাথে কাজ করা ছাড়াও আমার নিজের একটি ছোট dispensary আছে। মাঝে মধ্যে সেখানে এসে বসি। টুকটাক জ্বর-পেট খারাপের রুগী দেখে ওষুধপত্র দেই। শচীনের অবশ্য সেদিকে বালাই নেই। একবার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে মানে আর ওদিকে ফিরেও তাকাবে না। পারিবারিক পিছুটান নেই কারণ শচীনের দাদা একাই সেদিক সামলায়।   আমি নিখাদ ভবঘুরে। ডাক্তারি পাশ করে শহরে এসেও কোন ফল না পেয়ে গ্রামে ফিরে গিয়েছিলাম। বাড়িতে বিয়ের তাগাদা শুরু হতেই পালিয়ে এলাম কলকাতা। শচীন একদিন দেখা করে নিজের একটা business idea share করে। নেমে পড়লাম ওর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। একটু যে বিপথে চালিত হতে শুরু করেছিলাম নিজের ethics বা বিবেকের থেকে। টের পেলেও, নেশায় মত্ত মানুষ যেমন আবেগ ভুলে ডুবে থাকে। আমাদেরও সেই পরিণতি হয় অবশেষে।

চেম্বার বন্ধ করে তালা লাগাচ্ছি, এমন সময় শচীন এসে দাঁড়ায়। হাতে একটা pendrive নিয়ে লুফতে লুফতে বলে,

"Mr. মল্লিকের যৌবন জীবনের লীলাময় চলচিত্র আর স্থিরচিত্রের সম্ভার।"

অবাক হয়ে প্রশ্ন করলুম "এ জিনিস কোথায় পেলে?"

"শত্রূদের হাতিয়ার, শত্রূ শিবির ছাড়া আর কোথায় পাওয়া যাবে বল?"

"রাকেশ এর সাথে দেখা করেছিলি?"

"আগে চা খাওয়া? তারপর সব বলছি। আজকে তোর ভালোই আমদানি হয়েছে, বুক পকেট দেখেই বোঝা যাচ্ছে।"

আমদানিই বটে। সাকুল্যে বারোশো টাকা পকেটে এসেছে ছয় বছর ডাক্তারি শিখে, আর চার বছর ভাগ্যের উপহাস সহ্য করে। তাও হাজারটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে। কলকাতা শহরে ডাক্তারি করার অনেক বিড়ম্বনা। আধুনিক শিক্ষিত মানুষের Net বুদ্ধির ফলে, আমাদের নেট দুর্বিপাকের সীমা নেই। জ্বরের ওষুধের সাথে antibiotic দিলেও, একশ প্রশ্নের জবাবদিহি।

যাক সেসব। কাজের কথায় আসি। চা খেতে খেতে শচীনের কাছে যা শুনলাম, তার সংক্ষেপ হল,

Facebook থেকে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, রাকেশ এখন ছবি তোলার পাশেও একজন DJ র সাথে কাজ করে। DJ আবার এক নারী চরিত্র। মেয়েটির সাথে রাকেশের যে গোপন সম্পর্ক রয়েছে, তা ছবি দেখে আন্দাজ করলেও শচীন সে সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য দেয়। আজ একটি pub এ রাকেশের যাওয়ার কথা, facebook events এ সেই উল্লেখ ছিল।


 অর্থহীন কিছু গানে, অর্থহীন beat সংমিশ্রণ করে অহেতুক পরিবেশন করাই এখনকার হাল fashion. আর তাতেই উন্মত্তের মত নেচে যায় তরুণ-তরুণী। Pub এর এক কোণে বসে beer খাচ্ছিল রাকেশ। চতুর্থ বোতল শেষ করবে বলে চুমুক দিয়েছে, শচীন গিয়ে তার পাশের chair এ বসে।


"সৌগত মল্লিক কে শুনলাম ভালোই বিপাকে ফেলেছেন?"

তিক্ত তরলের খানিকটা উজিয়ে ওঠে রাকেশের। বিষম খেয়ে যায়। একটু সামলে নিয়ে

"কে আপনি?"

"আমায় আপনি চিনবেন না। তবে আমরা দুজনেই যে opportunist সেটা বলতে পারি।"

"Scoundrel, তুমি জানো আমি কে?"

"বিলক্ষণ জানি! পরস্ত্রীদের কাছে ছদ্ম-সুখের পণ্য ব্যবসায় আপনার দোসর কি আর কেউ আছে বলুন?"

"মেরে এই pub এর এক কোণে ফেলে রেখে দেব, কেউ বাঁচাতেও আসবে না। আমায় রাগিও না বলে দিচ্ছি।"

"চোরের ওপর বাটপারি করার মজাই আলাদা। তবে, এটুকু বলতে পারি, আমি আপনার উপকার করতেই এসেছি।"

"তার মানে?"

রাকেশের কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে শচীন বলে, "নির্মলা দেবী যে আপনার আর ওই মেয়েটির সম্পর্কের কথা জানতে পেরে গেছেন, সে খবর রাখেন?"

কিছু বলার চেষ্টা করে রাকেশ, তাকে প্রায় থামিয়ে দিয়েই শচীন বলে, " নির্মলা দেবী যে সেই দুঃখে আপনাদের দুজনের সব কথা নিজের স্বামীর কাছে বলে দিয়েছেন সেই খবর রাখেন?"

"What da.......!"

ফোন  নির্মলার নম্বর dial করতে যায় রাকেশ। শচীন আবার বাধা দেয়।

"কোন লাভ নেই।"

"মানে?"

"আপনার থেকে দূরে যাওয়ার জন্যেই মল্লিক বাবু সস্ত্রীক বাইরে যাচ্ছেন।"

"কোথায়?"

"জানাতে আমার কোন দ্বিধা নেই, কিন্তু আমার মুনাফার দিকটাও তো দেখতে হবে?"

"কি চাই আপনার?"


"মল্লিকের company এর অর্ধেক মালিকানা তো আপনি পাচ্ছেন। আমায় যদি সেই  সাপেক্ষে সামান্য কিছু অর্থ দেন, আমি আপনাকে মল্লিকের বিষয়ে অনেক গোপন তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে পারি।"

"দেখ boss! আমার সাথে এ'সব চালাকি কোরো না!"

"ছি ছি! আমি নবীন মানুষ। আপনার এলেমের সাথে আমার তুলনা চলে? আপনি রাজি হলে, দুজনের লাভ ছিল। আপনার যখন এতই মেজাজ, তখন নাহয় থাক।" টেবিল থেকে উঠে আসার সময় শচীনকে বাধা দেয় রাকেশ।

"কি কি ছবি আছে তোমার কাছে?"

"ব্যবসার কথা কি আর এ'সব জায়গায় বসে হয় বলুন?"

চা পর্ব শেষ করে আমরা হাটতে হাটতে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছিলাম।

Pub এর ঘটনা শোনার পরে আমি প্রশ্ন করি।

"রাকেশ সব ছবি তোমায় দেখালো?"

"শুধু দেখানোই নয়, নিজে সব কিছু বুঝিয়ে বের করে দিয়েছে। মানে এখন আর মল্লিকবাবু কে blackmail করার মত কোন সামগ্রী ওর হাতে নেই।"

"ওকে manage করলে কিভাবে? পরে তো তোমার খোঁজ করবেই?"

"আগামী আটচল্লিশ ঘন্টার আগে ওর ঘুম ভাঙলে হয়।" শচীন আবার pendrive নিয়ে লুফতে শুরু করে।


"আবার সেই drug abuse?"

"না করলে উপায় কি বল?" হাসতে হাসতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যায় শচীন।

                                                                 //৫//
কথা মত পরের দিন মল্লিক বাবুর হাতে train এর টিকিট আর ছবি সমেত pendrive পৌঁছে দিয়ে আসি। রাত সাড়ে ন'টা নাগাদ phone করে সব কিছু বুঝিয়ে দেয় শচীন। অবশ্য, plan এর সিঁকিভাগ বলা চলে।
শচীনের plan মাফিক মল্লিকবাবুর প্রাথমিক কর্তব্য ছিল, সস্ত্রীক আলিপুরদুয়ার চলে যাওয়া। সেখানে হোটেল শিপ্রা-আলয় এ ওঠা এবং সেখানকার দোতলার কোন ঘরেই যাতে room পাওয়া যায়, সেই ব্যবস্থা করা। Train এর টিকিট জোগাড় ও পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে ছিলাম আমি। আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল জিনিসপত্র গুছিয়ে, contacts জোগাড় করে north bengal যাত্রা।

NJP থেকে গাড়ি ভাড়া নিয়ে সৌগত মল্লিক ও নির্মলা দেবী আলিপুরদুয়ার আসেন। হোটেল শিপ্রা-আলয়ে ১০৫ নম্বর ঘরে থাকার বন্দোবস্ত হয়। এতটা পথ আসার ধকল সামলাতে ঘরেই বিশ্রাম নেন সারাদিন। বিকেলে নিচে হোটেলের canteen এ বসে চা খাচ্ছেন, এমন সময় পিঠের ওপর একটা চর খেয়ে চমকে ওঠেন। মল্লিক বাবুর কলেজ জীবনের বন্ধু অনিমেষ চক্রবর্তী ছুটি কাটাতে এবার এসেছেন North Bengal. গত পরশুদিন অনিমেষ সপরিবারে এসে পৌঁছেছেন আলুপুরদুয়ার। আজ সকালে মাথাভাঙ্গা, জলদাপাড়া হয়ে ফুন্টশিলিং দেখে এইমাত্র ফিরেছেন। Canteen এ বিকেলের টিফিন আর চা order দিতে এসে পুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা।

"তারপর কি খবর বল?" চায়ের কাপে সশব্দ চুমুক দিয়ে, চায়ের কাপ টেবিলে রেখে প্রশ্ন করেন অনিমেষ।

"এই চলে যাচ্ছে।" সিগারেট ধরিয়ে বলেন মল্লিকবাবু।

"ব্যবসার খবর কি?"

"Politics আর economy একসাথে হা-ডু-ডু খেলতে শুরু করলে ব্যবসা কি আর ভালো থাকে, বল?"

"সে আর নতুন কি? আগেও ছিল, এখনো আছে।" চা শেষ করে নিজেও সিগারেট ধরান অনিমেষ।

"সেই আরকি। মন-মেজাজ ভালো নেই। তাই চলে এলাম।"

"ভালো করেছিস। আজকেই এলি?"

"হ্যা! কাল রাতে তৎকালে টিকিট পেয়ে গেলাম। চলে এলাম।"

"কোথায় কোথায় যাবি কিছু ভেবেছিস?"

"না না! সুযোগ পেলাম কোথায়। এই চা খেয়ে ভেবেছিলাম, হোটেলের  ম্যানেজার এর সাথে একটা plan বানিয়ে গাড়ি ভাড়া নেব।"

"বেশ তো! আমাদের সাথে চল। কাল আমরা গরুমারা হয়ে যাবো সাঁতালেখোলা। খুব ভালো জায়গা।"
জানলা দিয়ে বাইরের বাগানে সিগারেটটা ফেলে বলেন অনিমেষ।

"আমার আবার!" একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন সৌগত বাবু। একটু ভেবে নিয়ে বলেন, "নির্মলা আবার অন্য কোন plan ভেবেছে কি-না!"

"আহা! বৌদিকে সে ম্যানেজ করে নেওয়া যাবে। আছিস কোন room এ?"

"একশো পাঁচ।"

"বোঝ! আমরা আছি একশো সাতে। ভালোই হল, চল বৌদির সাথে আলাপটা সেরে আসি।"

"এখনই যাবি? আচ্ছা চল?"

"তুই কি নতুন বৌ নিয়ে আবার honeymoon করতে এসেছিস নাকি?"

চমকে ওঠেন মল্লিক বাবু। "মানে?"

"পুরোনো বন্ধুর সাথে বেড়াতে যাবি, এত ইতস্তত করার কি আছে বুঝিনা! নতুন বিয়ে করলে লোকে নাহয় privacy খোঁজে।"

একগাল হেসে পরিস্থিতি কিছুটা সরল করবার চেষ্টা করেন মল্লিকবাবু। তারপর চা-এর দাম মিটিয়ে, reception এ কালকের জন্যে দু'টো গাড়ি book করে দোতলায় যাওয়ার সিঁড়ির কাছে আসেন।

"তুই room এ যা বুঝলি। Fresh হয়ে নে।  আমি একটু বাইরে থেকে আসছি।"

"কেন, কি হল?"

কি বলবে বুঝে উঠতে না পেরে সিগারেট কিনতে যাওয়ার কথা বলে বিদায় নেন সৌগত বাবু। হোটেল থেকে বেরিয়েই শচীনকে ফোন করার চেষ্টা করেন মল্লিক বাবু। এদিকে ফোনে নেটওয়ার্ক নেই দেখে কোনভাবেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা। অগত্যা একটা চা-এর দোকান দেখে সেখানেই গিয়ে বসেন।

"বাবু আপনার চা!" একটা বাচ্চা ছেলে চায়ের কাপটা এগিয়ে ধরে। নিজের চিন্তায় একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন মল্লিক বাবু। বাচ্চাটার ডাকে সম্বিৎ ফেরে।


"Mobile এর roaming service টা off আছে বোধয়। Settings এ গিয়ে ওটা on করে দিন।" পাশে বসা এক ভদ্রলোকের মন্তব্য শুনে একটু হকচকিয়ে যান মল্লিক বাবু।

"আপনি কে?"

"শচীন সামন্তর মক্কেল তো আপনি?"

"আজ্ঞে?"

"আমি শচীন-দার agent. এখনো অব্দি যা যা হয়েছে, সবই শচীন দার plan মাফিক। সাঁতালেখোলা যাওয়ার plan টাও ছিল। কাজেই আগামীকাল বন্ধুর সাথে আপনি সাঁতালেখোলা যাচ্ছেন।"

"কিন্তু আমার কাজ?"

"কালকেই হয়ে যাবে। আজ রাতে বন্ধুকে নিজের ঘরে dinner এ নিমন্ত্রণ করুন। যে ছেলেটা খাবার পৌঁছতে যাবে, তাকে বকশিস দেওয়ার নামে উঠে যাবেন বাইরে। তারপর শচীনদার বলে দেওয়া amount এর টাকাটা ওর হাতে দিয়ে দেবেন।"

"শচীন বাবু কি এসেছেন এখানে?"

"তা আমিও জানিনা। আমায় যা বলতে বলেছিল। বলে দিলাম।"

ভদ্রলোক চা-র দাম মিটিয়ে বেরিয়ে যান।

                                                                        //৬//

সাঁতালেখোলা সত্যি ভারি সুন্দর জায়গা। এক জায়গায় গাড়ি পার্ক করে প্রায় এক কিলোমিটার মত হাটা পথ পেরিয়ে ঝর্ণার কাছে যেতে হয়। একটা ঝুলন্ত ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে একটা বাংলোর কাছে যেতে হয়। বেশ ভালোই ভিড় হয় এখানে। গাড়ি পার্কের জায়গায় অনেকগুলি ছোটখাটো খাবার দোকান রয়েছে। সেখানে নেমে মোমো খাওয়া হয়। তারপর খাঁটি দার্জিলিং টি এর চা খেয়ে রওনা দেন ঝর্ণার দিকে। বেশ খানিকটা পথ ঢাল বেয়ে নেমে গেছে। এক পাশে খাদ আর জঙ্গল। পাহাড়ের চুড়োর দিকে সাদা মেঘগুলো লেগে আছে। নির্মলা সেই দেখে বলে পাহাড়গুলো নাকি শ্যাম্পু করে আছে।
অনিমেষের স্ত্রী এবং নির্মলার মিল হয়েছে ভালো। দুজনেই বেশ গোটা রাস্তা নিজেদের ছবি তুলতে তুলতে আসছে। অনিমেষের ও ছবি তোলার বাতিক। DSLR নিয়ে এখানে সেখানে নানা রকম ভঙ্গিতে ছবি তুলে যাচ্ছে। নির্মলাকে আজ ভারী মিষ্টি দেখাচ্ছে।


অনিমেষের দুই ছেলে। বড়োটি সবে স্কুল ফাইনাল দিয়েছে, আর ছোট ছেলেও এক বছর বাদে স্কুল ফাইনাল দেবে।  নির্মলা কোনদিনও মা হতে পারবেনা জেনে খুব আফসোস হত মল্লিকবাবুর। অন্যদিকে প্রথম পক্ষের স্ত্রী তাকে একটি ফুটফুটে সন্তান দিয়েছিল। নিজের খামখেয়ালির জন্যে সেই সম্পর্ক নষ্ট করেছেন মল্লিকবাবু। সুমিত্রার সাথে divorce এর সময় ছেলের যাতে কোন অসুবিধা না হয় সব বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন মল্লিকবাবু। নিজের ব্যবসার অর্ধেক মালিকানা দিয়েছিলেন প্রথম স্ত্রীর হাতে। শর্ত ছিল, ছেলে কলেজে উঠলে ব্যবসার ভার নেবে। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে ওঠার পর সুমিত্রা তার ছেলেকে নিয়ে এসেছিল বালিগঞ্জের অফিসে। কয়েক যুগ আগে নিজের চেহারার সাথে একদম এক প্রতিফলন দেখে মনটা বড় দুর্বল হয়ে পড়েছিল মল্লিকবাবুর। কেবল মাত্র নিজের স্বার্থের কথা ভেবে যে ভুল করেছিলেন। আজ সেই ভুল যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে পরিহাস করছে।

ছেলেকে দেখার পর থেকেই নির্মলার প্রতি একটা চাপা রাগ জন্মেছিল মল্লিকবাবুর। যার জন্যে সব সুখ সে জলাঞ্জলি দিয়েছিল একদিন। আজ সেই নির্মলাই এক পর-পুরুষের সাথে ফন্দি করে তাকে বিপাকে ফেলতে চাইছে। যে সম্পর্কের শুরুই হয়েছিল অসহায়তার সুযোগ নিয়ে, তার পরিণতি আর কিই বা হতে পারে।

পকেটের মধ্যে তার দুর্বল মুহূর্তের ছবি ভরা pendrive টা মুঠোয় চেপে ধরেন মল্লিক বাবু। খাদের ধারে দাঁড়িয়ে নানা রকম মুখভঙ্গি করে নির্মলা selfie তুলছিল। Pendrive এর ছবিগুলো মল্লিকবাবু আসার আগেরদিন দেখেছেন। নিজের নগ্নতা বোধয় খুব অপ্রিয় হয়ে যায় একসময়। নির্মলার মুখের হাসি এখন বিষাক্ত ছোবল ছাড়া আর কিছু মনে হয়না। সমস্ত আবেগ, প্রেম, ভালোলাগা মুছে গিয়ে শুধুই মনে আসে এক ধাক্কা মেরে যদি খাদে ফেলে দেওয়া যেত নিজের ভুল কাজের মূর্ত প্রতীক কে। দাঁতে দাঁত চেপে নিজের রাগটা সংযত রাখার চেষ্টা করেন মল্লিক বাবু।

"মাকড়শার জালটা দেখেছিস?' অনিমেষের কথায় চিন্তার বুহ্য থেকে বেরিয়ে আসেন মল্লিকবাবু।


DSLR তাগ করে, লেন্সের শেষ সীমা ব্যবহার করে মাকড়শার জালের ছবি তুলছে অনিমেষ। সত্যি ভারী আশ্চর্য শিল্প এই প্রাণীর। দুটো গাছের গুঁড়ির মাঝে একটু একটু করে ফাঁদ বানিয়ে রেখেছে। শিকার একটু অন্যমনস্ক ভাবে উড়লেই এসে জড়িয়ে যাবে জালে। তারপর সেই ফাঁদে পেয়ে একের পর এক জলক বিস্তারে ঘিরে ধরবে শিকারী। সামান্য দম নেওয়ার অবকাশটুকু দেবে না। নিজের পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য দেখেই বোধয় রাগটা মাকড়শার জালে গিয়ে পরে মল্লিকবাবুর। পকেট থেকে পেনড্রাইভ টা বার করে ছুড়ে মারেন জালটার দিকে লক্ষ্য করে। অব্যর্থ নিশানা। মাঝ বরাবর দুভাগে ছিড়ে যায় শিকারির পাতা ফাঁদ।

ছবি তুলতে গিয়ে হঠাৎ এমনভাবে জালটা ছিড়ে যাওয়ায় লেন্স থেকে চোখ সরিয়ে মল্লিকবাবুর দিকে তাকান অনিমেষ। চাপা রাগ তখন সারা শরীরে খেলছে যেন।

"তুই ঢিল মারলি?" মল্লিক এর কাছে এসে দাঁড়ান অনিমেষ। "উফ! সৌগত। তোর স্বভাব আর পাল্টালো না। এখনো কুকুর বিড়াল দেখলে তেড়ে যাস?"

"না এমনিই।" সামান্য হেসে নিজেকে সামলে নেন মল্লিকবাবু।

"তোমরা কি ওখানেই থাকবে?" দলের বাকিরা অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল। অনিমেষ আর মল্লিকের দেরি দেখে প্রশ্ন করেন অনিমেষের স্ত্রী।

আবার চলা শুরু করে দুই বন্ধু। পথটা এখন খাড়াই অনেকটা উঠে গেছে। আগে যে এখানে গাড়ি যাতায়াত ছিল রাস্তা দেখলে বোঝা যায়। পাহাড়ের গা বেয়ে ছোট খাটো ঝর্ণা এসে পড়েছে রাস্তায়। আবার রাস্তা পেরিয়ে নেমে গেছে খাদে। ব্রিজের কাছে এসে ঝর্ণার রূপ দেখে সব অভিমান রাগ যেন মুছে যায়। পকেট থেকে ফোন বার করে ছবি তুলতে শুরু করেন মল্লিক বাবু।


নির্মলা আর অনিমেষের স্ত্রী ঢাল বেয়ে ঝর্ণার কাছে নেমে গেছে। অনিমেষের দুই ছেলেও এক পাথর থেকে অন্য্ পাথরে লাফিয়ে জলের স্রোতের সাথে খেলছে। অনিমেষ এক পাশ দিয়ে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে ছবি নিচ্ছে।

"এই শুনছ! আমার একটা ছবি তুলে দাওনা প্লিজ।" নির্মলা ডেকে বলে।

ঝর্ণার বিভিন্ন এক এক জায়গায় স্রোত এক এক রকম। সেইভাবে background নিয়ে খান কতক ছবি তুলে দিলেন মল্লিক।



প্রায় আধ ঘন্টা এইভাবে কেটে গেল টের পায়নি কেউ। একটা ছেলে চা নিয়ে আসায় সবাই মিলে বসা হয়। অবশ্য অনিমেষের স্ত্রী বা নির্মলা নিজেদের ছবি তুলতেই ব্যস্ত ছিল। Resort এর এক ঢালে কিছু বেঞ্চ আর চেয়ারের ব্যবস্থা আছে। সেখানে বসে দুই বন্ধু মিলে চা নেয়।

"বাবু ছবি তুলবেন?" একটি অল্পবয়সী ছোকরা গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়।

"আমাদেরই তো ক্যামেরা আছে?" অনিমেষ বলে।

"একটা ছবি তোলান না সাহেব। মাত্র কুড়ি টাকা। Instant photo."

"বাহ্ বাহ্! এখন এখানেও এই ব্যবসা? পুরী-দীঘা ছেড়ে এখন পাহাড়েও?" অনিমেষ মল্লিকের দিকে তাকিয়ে বলে।

"কুড়িটা একটু বেশী হয়ে যাচ্ছে না বাবা?"

"এই করেই তো রোজগার সাহেব। কুড়ি টাকায় আজকাল ভালো চাল ও পাওয়া যায়না।"

"তো আর কোন ধান্দা করতে পারো তো?" অনিমেষ বলে।

"মা-এর দোকান আছে ওই parking lot এ। এই সকালেই আমাদের যা ব্যবসা সাহেব। সন্ধ্যেবেলা তো কেউ আসে না। আমি এখন ছবি তুলি। মা দুকান সামলায়।"

"আহ ছাড়ো না অনিমেষ।" অনিমেষ আবার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, মল্লিক বাধা দিয়ে বলে ওঠে।

"শোন ছোকরা। আমাদের দুই বন্ধুর ভালো দেখে পাঁচটা ছবি তুলে দাও দেখি। ভালো হলে তবেই টাকা দেব।"

ছেলেটি বিভিন্ন জায়গায় দাঁড় করিয়ে, পাথরে বসিয়ে ছবি তুলে দেয় পাঁচটা। ছবি হাতে নিয়ে দাম মেটানোর সময় অনিমেষের স্ত্রীর চিৎকার শোনা যায়। Mobile এ ছবি তুলতে তুলতে বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিল নির্মলা। সবার চোখের আড়ালেই চলে গিয়েছিল প্রায়। একজন tourist হঠাৎ জলে কিছু পড়ার শব্দ শুনে এগিয়ে গিয়ে দেখে নির্মলা ভেসে যাচ্ছে স্রোতের টানে। ঐদিকে কেউ যায়না কারণ স্রোত বেশি। পাথরগুলোতেও শ্যাওলা জমে আছে। পা স্লিপ করে তাল সামলাতে না পেরে জলে পরে গিয়েছে নির্মলা। ছবি তোলার ছেলেটা সৌগতর কাছে ফোনটা চায় পুলিশে ফোন করবে বলে। সৌগত নিজের ফোনটাই দিতে গিয়েছিল, কিন্তু tower নেই দেখে ছোট ফোনটা দেয়। অনিমেষ এগিয়ে গিয়েছিল অনেকটা। ফোনটা হাতে নিয়ে আমি নিজের টুপিটা খুলে বললাম, "আপনার কাজ হয়ে গেছে সাহেব।" ব্রিজ পেরিয়ে আসার সময় একবার ফিরে দেখেছিলাম। হতভম্ব হয়ে একই ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন সৌগত মল্লিক। সাঁতালেখোলার রূপ আর বন্ধুর সঙ্গ পেয়ে বোধয় ভুলেই গিয়েছিলেন আমাদের ওপর দেওয়া দায়িত্ব।


                                                                          //৭//
কলকাতার অনেকগুলি কাগজেই খবরটা বেরিয়েছিল। "Accidental death of Nirmala Mullik". কাগজটা নামিয়ে শচীনের দিকে তাকাতে দেখি সে অতি কষ্টে কুঁজো হয়ে বসে পা-এর নখ কাটতে ব্যস্ত।

"সেদিন মল্লিকবাবুর অভিব্যক্তিটা দেখার মত ছিল। আমি তো সামনেই ছিলাম। উনি বোধয় expect করেননি এইভাবে আমরা কাজটা করে দেব।"

"তাহলে শ্মশানে মল্লিকবাবুর অভিব্যক্তিটা দেখলে কি বলতি?"

"তুই গিয়েছিলিস শ্মশানে?"

"বা-রে! যাবোনা? নিজের কুকীর্তির প্রমাণপত্র আগুনে পুড়ে ছাই হল কিনা চাক্ষুস করব না?"

"কি দেখলি?"

ডান পায়ের নখ কাটা শেষ করে বাম পায়ের নখগুলো কাটতে কাটতে বলে,

"মল্লিকবাবু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন নির্মলা দেবীর শরীরটার সামনে। পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছে একবার নিচু হলেন। তারপর নির্মলা দেবীর কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিস করে কিছু বললেন। সমবেত সবাই ভাবল আহা কি ভালোবাসা। তবে....."

"তবে?

"সত্যি চোখের জল ফেলতে দেখলাম আরেকজনকে।"

"কে?"

"রাকেশ যাদব"

"সে-ও গিয়েছিল নাকি?"

"এক কোণে আড়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যদিও মল্লিকবাবুর কাছেও ব্যাপারটা এখনো shocking."

"আর যোগাযোগ করেছিলেন?"

"না না! পাগল নাকি? একটা জিনিস যেটা বুঝলাম এই কাজটা করে..."

"কি বুঝলি?"

"দ্বিতীয় পক্ষ ব্যাপারটা বেশ রসের। কি বলিস?"

"ব্যোমকেশ থেকে dialogue ঝেপে বলছ ভায়া? এদিকে আমাদের পিছনে যে কোন টিকটিকি কবে লাগবে তার নেই ঠিক।"

"সে কি আর লেগে নেই ভাবছিস? তাই বলে সেই রসে বঞ্চিত থাকাটাও কি জরুরি?"

"আরে বাবা! তুই কি বিয়ের মতলব আটছিস নাকি?"

"পাগল! যা কাজ করি, কবে আমাকেই পটল তুলতে হবে তার নেই ঠিক। খামোকা একটা মেয়েকে কষ্ট দেব?

আমি আবার কাগজে মন দি। এমন সময় শচীনের mobile এ একটা ফোন আসে। নখ কাটতে ব্যস্ত থাকায় আমায় ইশারা করে ফোনটা ধরার জন্যে।

"হ্যালো"

"কৌস্তভ আছে?" ওপার থেকে এক নারী কন্ঠস্বর ভেসে আসে।

আমি অবাক হয়ে শচীনকে বললাম, কৌস্তভ কে চাইছে। প্রায় ছোঁ মেরে ফোনটা আমার হাত থেকে নিয়ে বারান্দায় চলে যায়। নতুন মক্কেল, না কৌস্তভের প্রেমিকা, আমি জানিনা। শুধু খবরের কাগজে একটা ছবি দেখে সেদিনের কথা মনে পরে গেল। নির্মলা আর অনিমেষবাবুর স্ত্রী ব্রিজটাকে background করে দাঁড়িয়ে আছেন। আর দুই বন্ধু মিলে ছবি তুলছেন। শচীন নিজের location এ পৌঁছে গেছে। আমিও মেক-আপ নিয়ে মল্লিকদের আশেপাশে ঘুরছি। সেই মুহূর্তের তোলা নির্মলা দেবীর একটা ছবি কাগজে বেরিয়েছে।














গল্পের সব চরিত্র কাল্পনিক। বাস্তবে কারো সাথে কোন ঘটনার মিল সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয়। 

সহকারী: আগন্তুক। 
 কৃতজ্ঞতা স্বীকার: Google images .