Corona লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Corona লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২০

The Plummet 2.0???

নৌকো ডুবি ২.০???

হওয়ার তালে, পালের টানে নৌকো দিব্য চলেছিল এগিয়ে। নদীতে তখন ভরা উজান। ঢেউ এর ওপর ঢেউ। সাগর পারে এসে নৌকো ভরাট শুরু হলো। মজদুর এলো, পাইক এলো, বিদ্বান এলো, মূর্খ এলো, নাবিক, বরকন্দাজ, পাল বাহক, মাল বাহক, এটা সেটা, অমুক তমুক আরো কত কি। হঠাৎ নৌকোর যে মেরামত করে, সে এসে জানান দিলে নৌকোর ঠিক মাঝ বরাবর একটা ফুটো হয়েছে। মোটর রুমে জল ঢুকছে। কিছু একটা করা দরকার। নৌ প্রধান বললে "কিস্যু হবে না। এই টুকু তো পথ। সাত দিনের যাত্রা। ঠিক পেরিয়ে যাবো। জল বের করে ফেলার জন্যে আরো কিছু মজদুর নাও।"  যেমন প্রস্তাব তেমন কারবার। বন্দর থেকে মাল ও যাত্রী বোঝাই নৌকো, পারি জমালো সমুদ্র পথে। 

যাত্রীরা কেউ জানে না নৌকোর মাঝে ফুটো। তাই দিয়ে যে ক্রমাগত জল ঢুকছে। তারা তো নিজের আমেজ এ মত্ত। সাগর পাড়ে বেড়াতে এসে তাদের যেন ছুটির মেজাজ। একবার নৌকোর ছই এর ওপর ওঠে। কেউ আবার সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে স্নান করে। কেউ লগী ধরে টান মারে। কেউ মাস্তুলে চড়ে বসে থাকে। কেউ আবার মাছ ধরার জাল নিয়ে সাগরে ফেলে। কানকো টিপে মাছ না নিলে কি আর পোষায়??? এদিকে নৌকোর দোলা চালে জল ভরে বেশি। এত লোক হয়ে ওজন ও হয়েছে বেশি। তবু যাত্রীদের কোনো হেলদোল নেই। তারা দিব্যি লাফায়, নাচে গায়। কি যায় আসে?

এমন সময় দ্বিতীয় দিনে, সাগর তখনো বেশি গভীর নয়। এই পথে যাওয়া আরেকটি ডিঙ্গি নৌকা মাঝ পথে খারাপ হয়ে যাওয়ায়, এই নৌকার প্রধান খবর দিলেন ডিঙ্গি যাত্রীদের তুলে নিতে। আর তো মোট পাঁচ দিনের পথ। ঠিক হেসে খেলে কেটে যাবে। ভাঙ্গা ডিঙ্গি থেকে যাত্রী এলো শেষে। নতুন যাত্রীদের সবাই হাত তালি দিয়ে অভ্যর্থনা করে নৌকায় তুলে নিলো। কেউ কিস্যু টের পেলো না। নৌকায় জল যেন আরো স্রোতে প্রবেশ শুরু করলো। ওদিকে পাটার ওপরে উৎসব, এদিকে খোল ভর্তি জল। মেরামতির কারবারি, জল বের করার শ্রমিক সব মিলে নাজেহাল। ক্রমে পেরোলো তৃতীয় দিন।

তৃতীয় দিনে নৌকা যেন মাঝ সমুদ্রে হাহাকারে। চারিদিকে নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে সব নৌকা স্থবির হয়ে আছে। সামনে বিশাল তুফান। এখানে অব্দি আসতেও আর দেরী নেই। তবু যদি প্রকৃতি সদয় হয়, তাই ভয়ে আর কোনো নৌকা এগোতে সাহস পায়না। ঝরের মধ্যে পাছে ঠোকাঠুকি লাগে, তাই সবাই নির্দিষ্ট দূরত্বে নোঙর ফেলে ভাসছে। আসন্ন ঝড়ের কথা ভেবে প্রমাদ গুনছে আর অপেক্ষা করছে আগত প্রলয়ের। আমাদের আলোচ্য নৌকোর প্রধান ও ঠিক বুঝে নোঙর ফেলতে বললেন। মেরামতির লোক, জল ফেলার লোক, বৈঠা বাহক সবাই হা হা করে উঠলো। হায় একি হলো। এই উন্মত্ত যাত্রীদের সাথে ঝড়ের মাঝে ফুটো নৌকায় থাকা আর কাঠের টুকরো সম্বল করে স্রোতে ভাসা একই ব্যাপার। কিন্তু কি আর করা। প্রধান যখন ঠিক মনে করেছেন। তাই হবে। 

আমরা ডাঙায় যে ঝড়ের সাথে অভ্যস্ত, সমুদ্রে তা আরো হিংস্র। উঁচু উঁচু ঢেউ এর বাড়ি এসে পরে নৌকার পাটা তে। নোঙর করলে নৌকায় যে দুলুনি এসে লাগে তাতে অর্ধেক লোকের বমি ছোটে। চতুর্দিক কালো করে অধার মেঘ ঘনিয়ে এলো। ঝড়ের হালকা ঝাপটা দিতেই নৌকা ভীষণ দুলে উঠলো। আর তাতেই যাত্রী কিছু একেবারে টাল সামলাতে না পেরে জলে পরে গেলো। মাঝি মাল্লা আর মেরামতকারী  জলে ঝাঁপিয়ে পরে কিছু যাত্রীকে উদ্ধার করে। বাকিরা সলিলে সমাধি। এক জায়গায় দাড়িয়ে গেলে নৌকায় জল ঢোকে বেশি। এদিকে কোনো উপায় নেই। জল বেড় করার কর্মীরা হাত টেনে কাজ করে যেতে থাকে। কিন্তু এক পোয়া জল টানলে তিন পোয়া জল হুস হুস করে খোলার ভিতর ঢোকে। তার ওপর ঝড়ো হওয়ার দাপটে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ এসে নৌকায় চড়াও হয়। তার জলেও খোলা ভেসে যায়। 

মেরামতির কর্মীরা সাবধান করে। তারা নৌ প্রধান কে স্পষ্ট জানায় একেই ঝড়ের দাপটে এত দুলুনি। তার উপর যাত্রীদের কোলাহলে মত্ত নৌকার ভাঙ্গা অংশ মেরামত করা যাবে না। নৌ প্রধান বুঝলেন সব। নির্দেশ দিলেন সব যাত্রীকে এক জায়গায় বসে থাকতে। সবাই সব কিছু শুনলে মন দিয়ে, বুঝলেও কিছু বিচক্ষ্ন লোক। কিন্তু মানুষের প্রবৃত্তি কে নিয়ন্ত্রণ করতে স্বয়ং ভগবান পারেন না তো সামান্য নৌ প্রধান। কিছু লোক হুট পাটি করে লেগে গেলো খবর সংগ্রহ করতে। কি এমন হলো যে একেবারে নৌকা নোঙর করে দাঁড়িয়ে গেল। শুধু তো দাড়িয়েই গেলো না একেবারে সবাইকে স্থির হয়ে বসার নির্দেশ দিলো। তারা এই প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে বেড়ায় খবর সংগ্রহ করতে। কিছু যাত্রী মাছের জাল নিয়ে নৌকার কিনারায় গিয়ে বসে। টাটকা মাছের ঢের যখন সামনেই আছে খাবার কষ্ট করে কি কোন লাভ আছে?? তারা জাল ফেলে মাছ ধরে। পাটা তে উঠে হই হল্লা করে। কিছু লোক আবার মাছ ধরা দেখবে বলে নৌকার কিনারে যায়। কিছু মাছ খাবার লোভে যায়। সে এক অতি নাটকীয় পরিস্থিতি।

এমন সময় কোন এক খবর বাজ চুকলি কাটলো। খবর চাউর হলো নৌকায় যে ফুটো আছে। ব্যাস! আর কোথায় যাওয়া। নৌকার উপর যেন হুজ্জুৎ শুরু হয়ে গেল। যারা যারা মাছ ধরছিল কিছু উল্টে পরলো জলে। তাদের বাঁচাতে কিছু মাঝি ও ভেসে গেলো। কিছু যাত্রীকে হাঙ্গরে খেলো, কিছু যাত্রী ডুবে মরলো। যত খবর চাউর হয় কেউ মরেছে, যাত্রীরা তত বেশি হুট পুটি করে। আরো কিছু যাত্রী উল্টে পরে সমুদ্রের জলে। কিছু যাত্রী আবার কেমন করে নৌকায় জল ঢুকছে দেখার জন্যে খোলার মধ্যে ভিড় করে। সে এক হুলুস্থুল কান্ড। যারা মাস্তুলে চড়ে ফুর্তি করছিলো। নৌকোর দুলুনিতে টপাটপ জলে পরলো। আর তাদের বাঁচাতে মেরামতির কাজ বন্ধ রাখতে হয়। অযথা সময় নষ্ট হয়। নৌকায় আরো জল ঢুকে পরে। জল ঢোকার পথ বন্ধ করার কোন উপায় নেই দেখে নৌ প্রধান মেরামতির লোকদের ডেকে পরামর্শ করলেন। ঠিক করা হলো কিছু মেরামতির লোক সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে জলের তলা থেকে গিয়ে নৌকার ফুটো অংশ মেরামত করবে। ঝড়ের আসতে এখনো বেশ কিছু দিন। যাত্রীরা যদি একটু সংযত হয়, নৌকার কিছু হলেও একটু উন্নতি হবে। অন্তত জলের গতি আটকানো যাবে। অতিরিক্ত লোক তুলে এখন বিপদ বেড়েছে। তো যেমন ভাবা তেমন কাজ। মেরামত এর কিছু লোক ঝাঁপ দিল জলে। কিন্তু কি আর করা। জল ভর্তি হাঙ্গর। অস্ত্র না থাকায় প্রথম দিকের সব মেরামতির লোক হয় আহত হলো, নয় মরে গেল। নৌ প্রধান এর আর কি দোষ? সব্জি কাটার ছুরি হাতে দিয়ে মেরামতির লোকদের আবার জলে নামিয়ে দিলো। 

আরে!! মেরামতির লোকেরা তো শুকনো জমিতে কাজ করে অভ্যস্ত। এমন মাঝ সমুদ্রে কাজ করা যায় নাকি? তার ওপর কেউ তো আর ডুবুরি নয় যে জলের নিচে অত সময় দম ধরে রাখবে। ব্যাস! শুরু হলো কষ্ট। একটু করে ডুব দেয়ার পরেই উঠে আসে হাফাতে হাফাতে। যাত্রীরা সব নৌকার উপর থেকে গালি গালাজ করে। কেউ উপদেশ দেয়, কেউ আবার ঢিল ছোড়ে। জল বের করার লোকে এসে বাধা দিলে লাথি মারে গালি দেয়। নৌ প্রধান হতাশ হয়ে মাথা চুলকায় আর ভাবে। একটু একটু করে ঝড় এগিয়ে আসছে। কি যে হবে??? এদিকে মজুত করা খাবার শেষের পথে প্রায়। সাত দিনের হিসেবে মাল নেওয়া। সেই মাল নিয়ে এত গুলো লোকের কদিন আর চলে। যাত্রীরা কিন্তু বেজায় ফুর্তিতে আছে। কিছু লোক আতঙ্কে ছুটে বেড়ায়। কিছু লোক কিছু না ভেবেই জলে ঝাঁপ দেয়। কিছু লোক ভাবে বেশী দূর তো আর আসিনি সাগর পথে। তাই বাড়ি যাবে বলে জলেই ঝাঁপ দেয় উল্টো পথে সাঁতরে যাবে বলে। এত অরাজকতা তে কি আর মেরামতির কাজ হয়?? নাবিকরা সব প্রমাদ গোনে। হাল বাহক হাল ছেড়ে দেবার কথা ঘোষণা করে। বৈঠা বাহক আর মাস্তুলবাজ ঘোষণা করে নৌকা ভারী হচ্ছে বলে হাল্কা করা দরকার। জল বেড় করার কাজে কিছু যাত্রী এগিয়ে আসে। কিন্তু কত আর সম্ভব? এই সব কাজে মেহনত এর থেকেও অভিজ্ঞতা লাগে বেশি। এখন পালা নৌকা হাল্কা করার। কি করা যায় কি করা যায় অনেক পরিকল্পনা করেও কোনো উপায় খুঁজে পাওয়া যায়না। এমন সময় মাতাল মাঝি এসে খবর দিল, ওই দেশে বিক্রির জন্য নৌকায় অনেক পেটি মদ উঠেছে। কিছু মদের বোতল জলে ফেলে দিলে নৌকা হাল্কা হবে। মাঝির প্রস্তাব যথেষ্ট যুক্তির। আর কোনো কথা নেই। খুলে দেওয়া হলো মদের পেটি। হাল বাহক যারা হাল ছেড়ে দেবে ভেবেছিলো, তারা বললে, "আরে দাড়ান মশাই দাড়ান। দুম করে অমন মদের বোতল ফেলে দেবেন না। এত যাত্রীদের জন্য নৌকার যে ক্ষতি হলো, তার একটা খরচ নেই??? একটা কাজ করুন মশাই। যাত্রীদের বলা হোক যে মদের বোতল বিক্রী আছে। তোমরা কিনে খাও বা ফেলে দাও, মোট মাট নৌকা হাল্কা হওয়া চাই।"

এমন প্রস্তাব কার না ভালো লাগে?? মাঝ দরিয়ায় ঝড়ের মুখে মৃত্যুর সাথে লড়াই করতে করতেও মদের সাহচর্য পেতে। একবার খবর জানাজানি হতেই যাত্রীদের মধ্যে সে কি উন্মাদনা। এদিকে পয়সা নেই বলে নৌকায় ওঠার সময় ঠিক মত ভাড়া দেয়না। কিন্তু মদের বেলায় ঠিক পয়সা আছে। এই না হলে মানুষ?? ব্যাস!! বোতলের পর বোতল বিক্রি হলো, পেটি সব খালি হলো, ফাঁকা বোতল জলে গেল। নৌ প্রধান এর ঘরে পয়সা এলো। মেরামতির খরচা থেকেও অনেক উপড়ি বরং জমা হলো। হাল বাহকরা বেজায় খুশি। কিন্তু তারা যেটা ভাবেনি সেটাই হলো অবশেষে। এত মাল পেটে গেলে স্বয়ং ঈশ্বর নিজের মতি স্থির রাখতে পারেন না সেখানে এরা তো সাধারণ মানুষ। নৌকার উপর হুলুস্থুল লেগে গেলো। যে সব মেরামতির লোকেরা প্রায় নৌকার ফুটো বন্ধ করে এনেছিল, আবার সেই কাজে ব্যাঘাত ঘটলো। নৌকার এত দুলুনিতে কাজ করা সম্ভব না তার ওপর জলের তলায় দম আটকে। নৌ প্রধানের কাছে তারা নালিশ জানায়। মাঝি মাল্লা কিছু মাতাল সামলাতে চেষ্টা করে। কিন্তু কা কষ্য!! মাতাল হয়ে সব ছড়া কাটে। নৌকার মাস্তুলে চড়ে পদ্য আওড়ায়। আর কিছু জলে পরে। এদের আবার জল থেকে তোলার কাজ করতে গিয়ে কিছু মেরামতির কর্মী কেউ হাঙ্গরের পেটে গেলো, কিছু ডুবে মরলো। বেশ কিছু আহত হলো। 

আর যায় না সামলানো। নৌ প্রধান বললেন যা হয়েছে বেশ হয়েছে। আর অপেক্ষা করে লাভ নেই।  নৌকা নিয়ে ঝড়ের মধ্যে এগোনোর নির্দেশ দিলেন। যা থাকে কপালে। একটু একটু করে নৌকা এখন সেই ঝড়ের দিকে এগোচ্ছে। প্রকৃতি নিজেই ঝড় কে বন্ধ করে নৌকার উপর করুণা বর্ষণ করে সবাই কে বাঁচাবে, নাকি যাত্রীরা নিজেদের সংযত রেখে নৌ প্রধানের কথা শুনবে?? কি পরিণতি হয় এখন সেটাই দেখার। আর সেই অপেক্ষাতেই রয়েছে নৌকো ডুবির উপসংহার। 

(C) পাগলা দাশু

শনিবার, ৯ মে, ২০২০

COVID-19 and Dentistry (Bengali)

          


নিয়ম বদলের করোনা সঙ্ক্রমণ!!

 

    একটু একটু করে সব কিছু বদলে দিলো এক নতুন মহামারী করোনা। চিকিৎসা ব্যাবস্থা সহ গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সমস্ত প্রেক্ষাপটে প্রভাব রয়ে যাবে এই করোনা সঙ্ক্রমণের। গত কয়েক মাসের সংবাদ মাধ্যম বা ডিজিটাল মিডিয়া সুত্রে আমরা অনেকটাই অবগত এই নতুন নিয়ম সম্পর্কে। কিন্তু কিছু ফাঁক তো থেকেই যায় নিজের জানা ও বোঝার মধ্যে।

 

করোনা সম্পর্কে এত ভয় কেন?

     ভয়ের কারণ আসলে রোগটার বয়স বড্ড কম আর একদম অজানা প্রভাব। এই করোনার মতই মারাত্মক সংক্রামক রোগ হল Chicken Pox, Measles, Tuberculosis, SARS, MERS ও আরও অনেক। একজন Pox/Measles এর রুগী তার অজান্তেই আসেপাশের দশ জন রুগীকে সংক্রামিত করতে পারেন। কিন্তু এখন যেহেতু এই রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে আমরা অনেক বেশী সতর্ক ও অভ্যস্ত তাই অনেক সড়গড় এই রোগের চিকিৎসায়। নিশ্চই এতদিনের খবর থেকে আপনারা আন্দাজ পেয়েছেন সারা বিশ্ব কি ভাবে এই রোগের চিকিৎসা করতে নাজেহাল হয়েছে। তিন মাস লেগে গেছে শুধু এই টুকু জানতে যে কোন ওষুধ ঠিকঠাক কাজ করবে এই অসুখে। আর এইখানেই যত বিপত্তি। রোগটি সম্পর্কে আমরা এখনও একটু হলেও ধন্দে রয়েছি। কাজেই এই রোগের চিকিৎসা বা সংক্রমণ প্রতিরোধ সম্পর্কে আমরা একদম সঠিকভাবে ওয়াকিবহাল নই। যে কাজ হচ্ছে বা ভাবা হচ্ছে সম্ভাব্য সংক্রামক প্রতিরোধ এর জন্য তাও একটা আন্দাজে।

 

 

 

দাঁতের ডাক্তারির সাথে কি সম্পর্ক?

     একজন দাঁতের ডাক্তারের কাজটাই সীমাবদ্ধ মুখমণ্ডলে। করোনা ভাইরাসে সংক্রামিত রুগীদের ক্ষেত্রে মূল অসুখটি শ্বাসনালীর (Upper Respiratory Tract Infections)। আমাদের মুখগহ্বর ও নাসা পথের মধ্যে এই ভাইরাস স্থায়ী হয়। কিছু গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়েছে এই ভাইরাস নিজের গোপন সুরক্ষিত আস্তানা বানিয়েছে মানুষের লালা গ্রন্থিতে (Salivary Glands)। আর এখানেই আমাদের দাঁতের ডাক্তারদের মূল সমস্যা।

 

আমাদের কাজে থুতুর অংশীদারি সবচেয়ে বেশী। রুগীরা আমাদের কাজের চেয়ারে বসে থুতু ফেলবেন। আমরা যে যন্ত্রপাতি ব্যাবহার করি, যেমন Root Canal Treatment, দাঁতের Filling করা, দাঁত বাধানো, দাঁতের Crowns & Bridges বানানো, Scaling বা দাঁত পরিষ্কার করা ইত্যাদি কাজে। সেই যন্ত্রপাতি থেকে মাইক্রো ড্রপলেট (Micro droplets) আকারে জলকণা তৈরি হয়। সেগুলি মুখের ভিতরে ধাক্কা খেয়ে বাইরে ছিটকে আসে। আর সঙ্গে আসে রক্ত, থুতু, মাইক্রো অর্গানিজম কিছু। একে বলে এয়ারোসল জেনারেটিং প্রসেডিয়োর।(AGP)


এয়ারোসল (Aerosol) এর বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়; একরকম সূক্ষ্ম দ্রবণের কণা যা বাতাসে দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয়ে ভেসে বেরাতে পারে। এই এয়ারোসল আমাদের স্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাস, কথা বলা, হাঁফানো, বা হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে তৈরি হয়। হিসেব করে দেখা গেছে, একজন মানুষ কোন রকম স্থান পরিবর্তন না করে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে হাঁচি দিলে, তার মুখ থেকে তৈরি এয়ারোসল বাতাসের মাধ্যমে প্রায় আট ফুট অব্দি দূরত্ব অতিক্রম করে মাত্র ২-৩ সেকেন্ডে। এর একটা খুব স্বাভাবিক উদাহরণ যেমন আপনার থেকে প্রায় দশ ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে কোন ব্যাক্তি বিড়ি বা সিগারেট ধরালে আপনি কোন রকম স্থান পরিবর্তন না করলেও গন্ধ পাবেন ৪-৫ সেকেন্ডের মধ্যেই। আর এখানেই লুকিয়ে রয়েছে সব থেকে বড় বিপদ।

 

 

দাঁতের ডাক্তারের কাছে আসলে তাহলে কি কি নিয়ম মানতে হবে?

 

Ø  প্রথম নিয়ম এবং সব থেকে কড়া নিয়ম মাস্কের(mask) ব্যাবহার। ডাক্তার না বলা পর্যন্ত আপনাকে মাস্ক পরেই থাকতে হবে। মাস্ক ছাড়া চেম্বারে আসা মানে নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনা। ডাক্তার নিজের সম্ভাব্য সব রকমের প্রতিরোধ ব্যাস্থার আড়ালে থাকবেন। কিন্তু ঠিক আপনার আগেই আসা রুগী যদি করোনা সংক্রামিত হয়ে থাকেন। তার শ্বাস প্রশ্বাসে তৈরি হওয়া এয়ারোসল আপনাকে সংক্রামিত করে দেবে। সঙ্গে করে আলাদা কোন ব্যাগ বা বড় প্যাকেট আনবেন না। একটি ছোট hand sanitizer শিশি নিজের কাছে রেখে দেবেন।  

Ø  দ্বিতীয় নিয়ম সামাজিক দূরত্ব (Social distancing) বজায় রাখা। চেম্বারের ভিতরে বা বাইরে ভিড় দেখলে অবশ্যই এড়িয়ে যান। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখুন। আমাদের কাজের জন্য রুগী প্রতি গরে ২৫-৩০ মিনিট সময় লাগে। ভিতরে কোন রুগীর কাজ চলছে আন্দাজ পেলে চট করে ভিতরে আসবেন না। একজন রুগীর কাজ হয়ে যাওয়ার পরে প্রায় ১০-২০ মিনিট সময় লাগে সব কিছু পরিষ্কার করে নিতে। বাতাসের স্বাভাবিক হতে সময় লাগে প্রায় 2 ঘণ্টা। কাজেই ভুল করেও চেম্বারে ভীর থাকলে ভিতরে আসবেন না।

Ø  এমন হলে কি করে চলবে? একটা চেম্বারে ভিড় তো হতেই পারে। তাই বলে চেম্বারে আসব না? এখানেই DCI থেকে নিয়ম লাঘু হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় কেবল মাত্র একটি রুগীকেই দেখা যাবে। তাও কাজের ওপর নির্ভর করে. 

    যেমন একজন রুগী যার স্কেলিং হবে। তার কাজ শেষ হওয়ার পরে অন্তত এক ঘণ্টা বিরতি দিয়ে তবেই পরের রুগীকে ভিতরে আসতে দেওয়া যাবে। এই কারণে প্রত্যেক রুগীর কাছে অনুরোধ, ঠিক সময়ে আসার চেষ্টা করবেন। কোন কারণে দেরী হতেই পারে। সেক্ষেত্রে আগে থেকে ফোন করে জানিয়ে দেবেন। যদি না আসতে পারেন তাহলে সেটাও জানিয়ে দেবেন আগে থেকে। সময় মত এসেও যদি দেখেন আপনার আগের রুগীর কাজ তখনও শেষ হয়নি। তাহলে বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করবেন। কোন বদ্ধ জায়গায় দাঁড়াবেন না। যেখানে হাওয়ার চলাচল রয়েছে সেখানে দাঁড়াবেন। সংক্রমণের সম্ভবনা কমবে।

Ø  দাঁতের ডাক্তারের কাছে পরিবার নিয়ে এক সাথে আসবেন না। কেবল মাত্র বাচ্চা, বয়স্ক মানুষ ও মহিলা রুগীদের সঙ্গে একজন করে বাড়ির লোক চেম্বারে আসতে পারেন। কোন শিশু যদি রুগী না হয় তাহলে তাকে নিয়ে চেম্বারে আসবেন না। নিতান্তই আসলে তাকে সঙ্গে নিয়ে সামলে রাখতে হবে। ছোট বাচ্চারা অজান্তে বিভিন্ন জায়গায় হাত দিতে পারে। তার থেকে বাচ্চাটি সংক্রামিত হতে পারে। অনেক সময় সংক্রমণ আটকানোর জন্য আমরা যেসব কেমিক্যাল ব্যাবহার করি সেগুলো বাচ্চাদের হাতে লাগতে পারে। এবং সেটা বাচ্চাদের মুখে গেলে খারাপ। কাজেই কোন ছোট বাচ্চাকে নিয়ে এলে অবশ্যই তাকে সামলে রাখতে হবে।

Ø  আপনি যদি কিছুদিন ধরে শ্বাস কষ্ট, জ্বর, বা সর্দি কাশি নিয়ে ভুগছেন। তাহলে অতি অবশ্যই আপনার দাঁতের ডাক্তারের কাছে আসা যাবেনা। হতেই পারে আপনি করোনা রোগে সংক্রামিত নন। কিন্তু এই অজানা রোগের ও রুগীর ভিড় আমরাও নিশ্চিন্ত নই কোন রুগী করোনা বহন করে আনবে। আপনি নিজের ইমিউন সিস্টেম এর দুর্বল মুহূর্তে সংক্রমণের মধ্যে এলে আপনার বিপদের সম্ভাবনা শতকরা নব্বই ভাগ।

Ø  আপনি নিজেও হয়ত জানেন না আপনি করোনা রোগে সংক্রামিত। বাজারের ভিড় হোক, কোন প্রবাসী আত্মীয় বা পরিবারের অন্য কারো থেকে কোন ভাবে আপনার শরীরে রোগটি হয়ত এসেছে। কিন্তু আপনার ইমিউন সিস্টেম (Immunity) এর কারণে সেটি প্রভাব ফেলতে পারেনি। ঠিক এই কারণে নিজের গতিবিধির যথাযথ বিবরণ ডাক্তারের কাছে স্বীকার করুন। কোন কারণে যদি সন্দেহ থাকে যে আপনি গত এক মাসের মধ্যে হয়ত কোন ভাবে সংক্রামিত হয়েছেন অন্য কোন মানুষের থেকে। সে কথা ডাক্তারের কাছে উল্লেখ করুন। সেক্ষেত্রে ডাক্তার, আপনার জন্য ওষুধের তালিকা সঠিক ভাবে নির্ধারণ করতে পারবেন। অনেক ওষুধ আছে যা আমাদের শরীরে ইমিউন সিস্টেমএর স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। তখন হয়ত করোনা রোগটি দ্বিতীয়বার আপনার শরীরে সংক্রমণের প্রভাব ফেলতে পারে।

চেম্বারে আসার পরে, একটি প্রশ্ন তালিকা আপনাদের দেওয়া হবে। প্রতিটি প্রশ্ন ভালোভাবে পড়ে তার যথাযথ উত্তর দেবেন। এই তালিকার সাথে একটি ফর্ম দেওয়া হবে। তার মধ্যে নিজের নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা নির্দিষ্ট ভাবে উল্লেখ করবেন। এই ফর্ম, ট্রেসিং (Contact tracing) এর কাজে ব্যাবহার হবে। ধরুন কোন কারণে যদি ডাক্তার নিজে এই রোগে সংক্রমিত হয়ে যায়। তখন এই ফর্মগুলির মাধ্যমে প্রশাসন আপনাদের ট্রেস (Trace) করতে পারবে ও প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা নিতে পারবে। কোন রকম তথ্যের গোপনীয়তা আপনার জন্যেই সহায়ক হবে না।

   কোন কোন কারণে একজন ডাক্তার আপনার চিকিৎসা করতে বিরত থাকতে পারেন?

    DCI (Dental Council of India) এর দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী একজন ডাক্তারকে তার রুগী নির্বাচনের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। *The Dental surgeon reserves right to treat/defer/refer/ me accordingly. (IDA, WB state branch published COVID-19 advisory for dental practice; page 16)

                     
                     যে যে রুগীর চিকিৎসা করা সম্ভব নয় পরিকাঠামোগত কারণে তা হল,
                     (Elective Dental Treatments) 

    ১) আপনি যদি March'2020 এর পরে বাইরের কোন দেশ বা রাজ্য থেকে ফিরে থাকেন সেক্ষেত্রে আপনার Elective Dental Treatments করা যাবে না।

২) আপনার পরিবারের কেউ, যে আপনার সাথেই থাকেন, তাদের মধ্যে কেউ বাইরের দেশ বা রাজ্য থেকে March'20 এর পরে এদেশে ফিরে থাকলে আপনার Elective Dental Treatments করা যাবে না।

৩) আপনার বাসস্থান যদি কোন করোনা সংক্রামিত এলাকার হয়, সরকারী ভাবে ঘোষিত Red Zone  (Containment zone), সেক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসা করা যাবে না।

৪) আপনি নিজে যদি করোনার রুগী হয়ে থাকেন, বা আপনার পরিবারের কেউ করোনা সংক্রামিত হয়ে থাকলে আপনার চিকিৎসা করা যাবে না।

৫) কোন কারণে একজন করোনা সংক্রামিত রুগীর সংস্পর্শে আপনি এসে থাকলে আপনার চিকিৎসা সম্ভব নয়। নিতান্তই যদি না করোনা নেগেটিভ এর রিপোর্ট আপনার কাছে থাকে।

৬) আপনি যদি শ্বাস কষ্টের রুগী হয়ে থাকেন, এবং নিয়মিত ইনহেলার (Inhaler) ব্যাবহার করে থাকেন, তাহলে আপনার চিকিৎসা (Elective Dental Treatments) করা সম্ভব নয়।

৭) আপনি যদি Diabetes এর রুগী হয়ে থাকেন এবং আপনার HbA1C >6.8% এর উপরে হয়ে থাকে। আপনার চিকিৎসা (Elective Dental Treatments) সম্ভব নয়।

৮) যে সকল রুগী হার্টের সমস্যার জন্য নিয়মিত রক্ত পাতলা করার ওষুধ খান। যেমন Deplat/Ecosprin জাতীয়। তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা (Elective Dental Treatments) সম্ভব নয়।

৯) নিয়মিত Steroid জাতীয় ওষুধ যাদের খেতে হয়, তাদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসা সম্ভব নয়।

 

 চিকিৎসা সম্ভব নয় কেন?
     চিকিৎসা সম্ভব নয় মানে রুগীকে দেখে ওষুধ দেওয়া যাবে না তা নয়। কোন রকম কাজ যেমন Root canal treatment, দাঁত তোলা, দাঁত বাধানো ইত্যাদি কাজ করা যাবে না। 
    
    

নিয়মের বেড়াজালে এখন সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যাবস্থা অনেক জটিল হয়ে উঠেছে। আপনাদের থেকে নির্ভরযোগ্য সহযোগিতা পেলে আবার চেম্বারের কাজ শুরু করা যাবে। সময় লাগবে একটু এই রোগের থেকে বেড়িয়ে আসতে বা সব নিয়ম কে অভ্যাস করে নিতে। কিন্তু চেষ্টা করলে আমরাই পারবো সংক্রমণ কে রুখে এই রোগ কে সমাজ থেকে সরিয়ে দিতে.

 

Dr. Arka Bhattacharya, BDS